নির্বাচন এলেও নদীর পাশে কেউ নেই—ত্রয়োদশ ভোটের তিস্তা হতাশা

নির্বাচন এলেও নদীর পাশে কেউ নেই—ত্রয়োদশ ভোটের তিস্তা হতাশা

শেখ রনদ সিমান্ত, বিশেষ প্রতিনিধি, রংপুর: উত্তরের জনপদের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস তিস্তা নদীকে ঘিরে বহুল আলোচিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ আজও আলোর মুখ দেখেনি। সময়ের পরিক্রমায় সরকার বদলেছে, রাজপথে আন্দোলন হয়েছে, এসেছে ভুরি ভুরি প্রতিশ্রুতি—তবুও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে তিস্তাপাড়ের মানুষের প্রাপ্তি কেবলই শূন্যতা। কয়েক দশকের বঞ্চনা আর অনিশ্চয়তাই যেন এখন এই অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের নিত্যসঙ্গী। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিটি আবারও নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।

বিগত সরকারের আমলে নদী শাসন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি ও কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর স্বপ্ন দেখিয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। চীনা অর্থায়নের সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘ সময় আলোচনা চললেও রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জটিলতা এবং অগ্রাধিকারের অভাবে সেই পরিকল্পনা কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, পাঁচ মাসের মধ্যে মহাপরিকল্পনাটি চূড়ান্ত হবে। তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে নির্বাচনের প্রাক্কালে পৌঁছালেও বাস্তবে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত দিনের মতো আবারও তাদের আবেগ নিয়ে রাজনৈতিক খেলা চালানো হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে এই বঞ্চনার প্রতিবাদে ‘তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও’ সংগ্রাম পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন দফায় দফায় মানববন্ধন, সমাবেশ ও স্মারকলিপি প্রদান করেছে। আন্দোলনকারীদের মতে, তিস্তা কোনো নিছক রাজনৈতিক ইস্যু নয়, এটি উত্তরের মানুষের বাঁচা-মরার প্রশ্ন। কিন্তু আন্দোলনের মুখেও কাঙ্ক্ষিত বাজেট বরাদ্দ কিংবা স্পষ্ট কোনো রোডম্যাপ এখনও ঘোষণা করা হয়নি। এবারের নির্বাচনের মাঠেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তিস্তা নিয়ে গালভরা বুলি আওড়ালেও বাস্তবমুখী কোনো কর্মপরিকল্পনা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে পাড়ের মানুষের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—ভোট আসে, প্রতিশ্রুতি আসে, কিন্তু তিস্তার দিন বদলায় না কেন?

তিস্তাপাড়ের বাসিন্দা আনসার আলী তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "সরকার যায়, সরকার আসে কিন্তু আমাদের দুর্দশার অবসান ঘটে না। ভেবেছিলাম দেশ দ্বিতীয়বার স্বাধীন হওয়ার পর এবার অন্তত স্বপ্ন পূরণ হবে। কিন্তু দুঃখ যার জীবনসাথী, তার আবার সুখ কিসের? অন্তর্বর্তী সরকারও শুধু আশ্বাসই দিয়ে গেল, বাস্তবায়ন দেখলাম না।" বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি ও কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর সিদ্ধান্ত ছাড়া এই ধোঁয়াশা কাটবে না। তিস্তা আজও অপেক্ষায় আছে—কবে এটি নিছক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে মানুষের জীবনের নদীতে পরিণত হবে।

এম.এম/সকালবেলা

মন্তব্য করুন