বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে যা আছে

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে যা আছে

রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শন হিসেবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে একটি ইনসাফ-ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে দলটি সুদৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।

আজ শুক্রবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এই ইশতেহার ঘোষণা করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আসন্ন নির্বাচনে তারেক রহমান দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং এটিই তার প্রথম ইশতেহার।

বেলা সাড়ে তিনটায় কোরআন তেলোয়াতের মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এ সময় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, জিয়াউর রহমানের ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং বিগত আন্দোলনে বিএনপির শহীদ নেতাকর্মী ও জুলাই গণ- অভ্যুত্থানে শহীদদের জন্য আল্লাহর দরবারে হাত তুলে মোনাজাত করা হয়। এরপরে  জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। 

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে এবং দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খানের পরিচালনা আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, সেলিমা রহমান, চেয়াম্যানের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন, মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুম্মন, শায়রুল কবির খান প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইশতেহারে ‘করব কাজ, গড়ব দেশ’ প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে বিএনপি। এই ইশতেহারের শ্লোগান হলো ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।

আগামী দিনে ক্ষমতায় গেলে ইশতেহারে ৯টি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে বিএনপি। ইশতেহারকে পাঁচটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। এতে মোট ৫১টি দফাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।

ইশতেহারে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বিস্তৃত সংস্কার ও সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, প্রবাসী কার্ড চালু, জনগণের কল্যাণে বহুমুখী সহায়তা কর্মসূচি, যুবকদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং জাতি গঠনে ‘ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনসহ দেশের কাঠামো ও পরিবেশের উন্নয়নে নানা পরিকল্পনা।

ইশতেহারে আওয়ামী লীগের শাসনামলে পুঁজিবাজারে সংঘটিত অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির তদন্ত, খতিব-ইমাম-মুয়াজ্জিনদের মাসিক সম্মানী প্রদানসহ বিভিন্ন জনমুখী ইস্যুকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় না দেওয়া, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নির্ভুল তালিকা প্রণয়ন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। নারী ও তরুণদের আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইশতেহারের বিষয়বস্তু চূড়ান্ত করা হয়েছে।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ছয় দিন আগে আজ শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার ঘোষণা করা হয়। অনুষ্ঠানে ইশতেহারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এতে সভাপতিত্ব করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন বিএনপি’র নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান।

বিএনপি জানায়, দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, প্রয়াত চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা এবং জুলাই জাতীয় সনদের সমন্বয়েই এই নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে।

ইশতেহারে বলা হয়, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতাকে সমুন্নত রেখে ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠাই বিএনপির মূল লক্ষ্য। মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে একটি ইনসাফ-ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে দলটি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শন হিসেবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে।

ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০, তারেক রহমানের রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা এবং জুলাই জাতীয় সনদে যেসব বিষয়ে যে আঙ্গিকে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো সেভাবেই বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

নির্বাচন ব্যবস্থা ও সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করে বিএনপি বলেছে, ‘ভোটকে রাষ্ট্রক্ষমতায় একমাত্র বৈধ উৎস হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে। নির্বাচন ব্যবস্থা ও সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে। ফ্যাসিবাদ ও বিদেশি তাঁবেদারিত্বের কোনো পুনরাবৃত্তি আর হতে দেওয়া হবে না। সমাজের সব স্তরে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করে সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে একটি প্রকৃত জনকল্যাণমূলক সরকার গঠন করা হবে। একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংরক্ষণ ও বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হবে।’

মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে নিবিড় জরিপের ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের নির্ভুল তালিকা প্রণয়নের অঙ্গীকার করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা ও এর স্মৃতি সংরক্ষণ করা হবে। মুক্তিযোদ্ধা উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়া হবে।

এছাড়া, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও গত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে শহীদদের নিজ নিজ এলাকায় তাদের নামে সরকারি স্থাপনার নামকরণ করা হবে। আন্দোলনে যারা পঙ্গু হয়েছেন বা চোখ হারিয়েছেন, তাদের স্বীকৃতি, উন্নত চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানে সহায়তা দেওয়া হবে। শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের সার্বিক সহায়তা নিশ্চিত করা হবে এবং তাদের কল্যাণে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি পৃথক বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হবে। 

রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতে ঘোষিত ৩১ দফার আলোকে ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ও পুনর্বাসনমূলক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় একটি ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

সুশাসন ও উন্নয়নের মূল ভিত্তি হিসেবে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা বলেছে বিএনপি। 

দলটি বলেছে, দুর্নীতির সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে পদ্ধতিগত ও আইন সংস্কারের পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। উন্মুক্ত দরপত্র ব্যবস্থা, রিয়েল টাইম অডিট, সরকারি ব্যয় ও প্রকল্পের ‘পারফরম্যান্স অডিট’ এবং ‘সিঙ্গেল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স’ বাস্তবায়ন করা হবে। অর্থপাচার রোধ ও ফ্যাসিবাদী আমলে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। 

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের প্রাণকেন্দ্র উল্লেখ করে বিএনপি’র ইশতেহারে বলা হয়, স্থানীয় সমস্যা স্থানীয় পর্যায়েই সমাধানের নীতি অনুসরণ করে শক্তিশালী ও কার্যকর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। যেখানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা বাড়ানো হবে, পর্যাপ্ত অর্থায়নের মাধ্যমে জনগণের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা ন্যস্ত করা হবে এবং উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ে অন্তত একবার উন্মুক্ত জনসভার আয়োজন করা হবে। বিলবোর্ডসহ উন্মুক্ত মাধ্যমে স্থানীয় সেবা সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করে স্বচ্ছতা ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।

দারিদ্র্য নিরসন ও সামাজিক সুরক্ষায় বিএনপি মানবিক, ন্যায়সংগত ও মর্যাদা ভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছে। যেখানে রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবে। পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মৎস্যজীবী ও প্রাণিসম্পদ খামারিদের ‘পেশাভিত্তিক কার্ড’ প্রদান করা হবে। দারিদ্র্য নিরসন ও সামাজিক সুরক্ষার আওতা সম্প্রসারণ ও সুশাসন বাস্তবায়ন করা হবে।

ইশতেহারে ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতে নিয়োজিত ব্যক্তিদের বার্ধক্যের দুর্দশা লাঘবের জন্য কার্যকর পেনশন ফান্ড গঠন, দারিদ্র্যপীড়িত ও পিছিয়ে থাকা অঞ্চলে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জাতীয় নাগরিক সেবা নিশ্চিতকরণ, পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হতদরিদ্র ও এতিম শিশুদের কল্যাণে একটি বিশেষ তহবিল গঠনের কথাও বলা হয়েছে।

সরকার গঠন করতে পারলে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পরিবারের প্রধান নারী সদস্যের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান, স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা এবং নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিকাশে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের অঙ্গীকার করেছে বিএনপি।

কৃষি উন্নয়ন ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সার্বিক সুরক্ষা দেওয়া হবে। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে ইশতেহারে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ চালুর কথা বলেছে বিএনপি। এছাড়াও বেকারভাতা প্রদান এবং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা, হাইস্কুল, সরকারি অফিস, গ্রামীণ ডিজিটাল সেন্টার, হাসপাতাল, রেলস্টেশন ও বিমানবন্দরসহ জনবহুল স্থানে বিনামূল্যে ইন্টারনেট চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং ক্যারিয়ার সেন্টার স্থাপন করার কথা দলটির ইশতেহারে বলা হয়েছে।

বিএনপি’র পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শনও ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। বিএনপি বিশ্বাস করে, বাংলাদেশের সীমান্তের বাইরে বন্ধু আছে তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। পররাষ্ট্রনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা ও জনগণের কল্যাণ সবার আগে প্রাধান্য পাবে। বিএনপি সকল রাষ্ট্রের সঙ্গে সমতা, ন্যায্যতা, বাস্তবধর্মী ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে এবং আন্তর্জাতিক বিধি-বিধান অনুযায়ী দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেবে।

সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স)-এর নীতিতে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার কথা বলেছে বিএনপি। আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক ও প্রতিরোধমূলক কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসব হুমকি সম্পূর্ণরূপে দমন করা হবে।

অর্থনীতিতে গণতন্ত্র ফেরাতে অলিগার্কিক কাঠামো (মুষ্টিমেয় গোষ্ঠী বা ব্যক্তির হাতে অর্থনীতি কুক্ষিগত থাকা) ভেঙে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ঋণনির্ভর অর্থনীতিকে বিনিয়োগমুখী অর্থনীতিতে রূপান্তর করাকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া, ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার অঙ্গীকারও করা হয়েছে বিএনপি’র ইশতেহারে।

ইশতেহারে আরও বলা হয়, বৈদেশিক বিনিয়োগ জিডিপি’র ২ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এছাড়াও বেসরকারি খাতের উন্নয়নে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং স্টার্ট-আপ খাতে গ্যারান্টি স্কিম, ক্যাশ-ফ্লো ভিত্তিক ঋণ, জেলার ক্যাপিটাল, ক্রাউডফান্ডিং ও ইনস্যুরেন্স কভারেজ বাড়ানো হবে। এই খাতে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হবে। ব্যাংক খাতের সুশাসন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার যৌক্তিকীকরণ এবং আস্থা ফেরাতে একটি অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠন করা হবে।

পুঁজিবাজার সংস্কারে ও উন্নয়নে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন-এর স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা হবে। ‘পুঁজিবাজার সুরক্ষা কমিশন’ গঠন এবং গত ১৫ বছরে পুঁজিবাজারে সংঘটিত অনিয়ম তদন্তে বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

উপকূলীয় অঞ্চলকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরকে ঘিরে সমন্বিত লজিস্টিক হাব প্রতিষ্ঠা করা হবে। শিল্পখাতে বিনিয়োগ সহজ করতে কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন থেকে শুরু করে ব্যাংকিং সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ও সঞ্চালন ক্ষমতা বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হবে এবং সঞ্চালন লাইন ২৫ হাজার সার্কিট কিলোমিটারে সম্প্রসারণ করা হবে। পরিকল্পনায় অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক ব্যয় কমানো, ক্যাপাসিটি চার্জ, রেন্টাল ও স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থার পর্যালোচনা, স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা হবে।

বিএনপি’র ইশতেহারে বলা হয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়নে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে এবং হার্ডওয়্যার উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করা হবে। এই খাতে ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং সবার জন্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা হবে। ভবিষ্যতের গ্রাহক ও ব্যবসায়িক চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একটি যুগোপযোগী ‘কানেক্টিভিটি ম্যানেজমেন্ট’ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হবে।

রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এটি স্বল্পমেয়াদে ২ শতাংশ এবং মধ্যমেয়াদে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। সরকারের ব্যয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা, রাজস্ব ব্যবস্থার ন্যায্যতা ও রাষ্ট্রীয় বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। 

দলটি বলেছে, দেশের সব অঞ্চলে সমতাভিত্তিক সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বিএনপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ক্ষমতায় গেলে নগরায়ণ ও আবাসনে পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলা হবে। সীমিত আয়ের মানুষ ও বস্তিবাসীদের জন্য আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। সমন্বিত বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা, ‘ভূমি ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা, ‘ভূমিসেবা মেলা’ আয়োজন, স্থানীয় সরকার ক্ষমতায়ন এবং ‘সিটিজেনস সার্ভিস কর্নার’ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

নিজ ধর্ম পালনে প্রত্যেককে স্বাধীনতা দিতে চায় বিএনপি। দলের ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’। প্রত্যেক নাগরিক নিজের ধর্ম পালনের পূর্ণ অধিকার ভোগ করবেন। কাউকে কোনো নাগরিকের ধর্মবিশ্বাসে আঘাত করতে দেওয়া হবে না। খতিব, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও অন্যান্য ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বৃদ্ধি করা হবে। ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।

গণমাধ্যম বিষয়ে বিএনপি’র প্রতিশ্রুতিতে বলা হয়, সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা ও কাজের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। আইনি জটিলতা ও হয়রানি দমন করা হবে এবং রাজনৈতিক পক্ষপাত বন্ধ করা হবে। জবাবদিহিমূলক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো প্রতিষ্ঠা ও সাংবাদিক হত্যায় বিচার নিশ্চিত করা হবে। সংবাদমাধ্যম কর্মীদের কল্যাণে জাতীয় সাংবাদিক অবসর কল্যাণ বোর্ড গঠন করা হবে।

মন্তব্য করুন