বিশেষ সংবাদদাতা: বাংলাদেশের কৃষি খাতের টেকসই উন্নয়নে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রতিষ্ঠানটির অবদান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পদে পদোন্নতি কেবল প্রশাসনিক নয়, বরং কৌশলগত একটি সিদ্ধান্ত, যা দেশের কৃষি গবেষণার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।
২০২৬ সালের ২২ এপ্রিল কৃষি মন্ত্রণালয়-এ প্রেরিত ১০ জন মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার তালিকা থেকে ৪ জনকে পরিচালক পদে পদোন্নতি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়াকে ঘিরে গুরুতর প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিদ্যমান অভিযোগ ও তদন্তের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে কি না—তা নিয়ে।
প্রতিবেদনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, তালিকাভুক্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে ডঃ আশিষ কুমার সাহার বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ সংক্রান্ত একটি বিভাগীয় মামলা চলমান রয়েছে। একইভাবে, ডক্টর নির্মল কুমার দত্তের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুর্নীতি দমন কমিশন) অর্থ আত্মসাৎ ও প্রকল্প অনিয়ম সংক্রান্ত তদন্ত চলমান। এছাড়া ডঃ হাবিব মোহাম্মদ নাসিরের বিরুদ্ধে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে বিভিন্ন ধরনের অবৈধ সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে বলে জানা যায়।
এমন গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও, এসব তথ্য পূর্ণাঙ্গভাবে যাচাই বা উল্লেখ না করে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে—যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন তোলে। একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে এসব অভিযোগ উপেক্ষা করা হলে তা প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও কার্যকারিতা উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে।
অন্যদিকে, একই তালিকায় এমন কয়েকজন কর্মকর্তা রয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ কর্মজীবনে কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি বা শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ নেই এবং যারা পেশাগত দক্ষতা ও গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, ডঃ কাউসার উদ্দিন আহমেদ, ডঃ মুহাম্মদ সুলতান আহমেদ, ডঃ মোঃ মোশারেফ হোসেন মোল্লা এবং ডঃ মোঃ হায়দার হোসেন—এই চারজন কর্মকর্তা সততা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার বিচারে এগিয়ে রয়েছেন।
বিশেষ করে ডঃ মুহাম্মদ সুলতান আহমেদ-এর পেশাগত অবদান অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। তিনি আন্তর্জাতিক মানের পেস্টিসাইড এনাইটিক্যাল ল্যাবরেটরীর প্রতিষ্ঠাতা বিজ্ঞানী ছিলেন। বহু আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ, ৫০টিরও বেশি গবেষণা প্রকাশনা এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে প্রযুক্তি উদ্ভাবন—এসবই তাকে একজন দক্ষ ও যোগ্য নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—পদোন্নতির ক্ষেত্রে কি শুধুমাত্র সিনিয়রিটির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, নাকি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সততা, পেশাগত যোগ্যতা, গবেষণা অবদান এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়বদ্ধতা বিবেচনায় নেওয়া হবে? উন্নত প্রশাসনিক কাঠামোতে যোগ্যতাভিত্তিক পদোন্নতি একটি স্বীকৃত ও কার্যকর নীতি।
সিনিয়রিটি একটি বিবেচ্য বিষয় হলেও, এটি একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না—বিশেষ করে যখন নেতৃত্বের বিষয়টি সামনে আসে। একজন পরিচালকের কাছে প্রত্যাশা থাকে স্বচ্ছতা, দক্ষতা, নৈতিকতা এবং গবেষণায় অগ্রণী ভূমিকা।
এই প্রেক্ষাপটে মাননীয় কৃষিমন্ত্রীর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা প্রয়োজন—যেন পদোন্নতির ক্ষেত্রে একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা হয়। প্রয়োজনে একটি স্বাধীন তদন্ত বা যাচাই কমিটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অভিযোগসমূহ পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশের কৃষি গবেষণার অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে হলে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে কোনো আপস করা চলবে না। তাই এখনই সময়—সিনিয়রিটির সীমা পেরিয়ে যোগ্যতা, সততা ও দক্ষতাকেই পদোন্নতির মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার।