ভিডিও
স্টোরি
ফটো স্টোরি
বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাস এলেই বাংলাদেশের আকাশে শুরু হয় এক ভয়ংকর লড়াই। দক্ষিণে উষ্ণ বাতাস আর উত্তরের শীতল বায়ুর সংঘাত থেকে জন্ম নেওয়া বজ্রমেঘ হয়ে ওঠে এক নীরব ঘাতক। প্রতিবছর বাংলাদেশে গড়ে প্রায় ৩০০ জন মানুষ বজ্রপাতে প্রাণ হারান, যার একটি বড় অংশই মে মাসে ঘটে। জলবায়ু পরিবর্তন, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন (বিশেষ করে তালগাছ) এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক এবং জলাশয়ে মাছ ধরা জেলেরা আজ সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে।
সর্বোচ্চ ঝুঁকির সময়: এপ্রিল থেকে জুন।
প্রাণহানির হার: গত এক দশকে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ২০১৬ সালে এক বছরেই মারা গেছেন প্রায় ৪০০ জন।
চলতি বছরের চিত্র: ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই অর্ধশতাধিক মানুষ বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত গোষ্ঠী: প্রায় ৭০-৮০ শতাংশই মাঠে কাজ করা কৃষক।
এক সময় গ্রামবাংলার তালগাছগুলো প্রাকৃতিক 'লাইটনিং অ্যারেস্টার' বা বজ্রনিরোধক হিসেবে কাজ করত। আকাশ থেকে আসা উচ্চ ভোল্টের বিদ্যুৎ উঁচু এই গাছগুলো টেনে নিত। কিন্তু নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে এখন খোলা মাঠে মানুষই হয়ে পড়ছে বজ্রপাতের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। এছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর পূর্বাভাসের অভাব এবং জনসচেতনতার ঘাটতি এই মৃত্যুমিছিলকে দীর্ঘ করছে।
বজ্রপাত ঠেকানো সম্ভব নয়, কিন্তু সঠিক প্রস্তুতি অনেক প্রাণ বাঁচাতে পারে:
নিরাপদ আশ্রয়: মেঘের গর্জন শুনলে দ্রুত পাকা দালান বা টিনের তৈরি ঘরে আশ্রয় নিন। খোলা জায়গা বা গাছের নিচে দাঁড়ানো সবচেয়ে বিপজ্জনক।
খোলা মাঠে আটকে পড়লে: মাটিতে শুয়ে পড়বেন না। পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে কান ঢেকে মাথা নিচু করে বসে পড়ুন, যাতে মাটির সঙ্গে শরীরের সংযোগ কম থাকে।
জলাশয় থেকে দূরে: মাছ ধরা বা গোসল করা অবস্থায় থাকলে দ্রুত পানি থেকে উঠে আসতে হবে। পানি বিদ্যুতের সুপরিবাহী।
গৃহস্থালি সতর্কতা: বজ্রপাতের সময় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি (টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার) বন্ধ রাখুন এবং ধাতব বস্তু বা জানালার গ্রিল স্পর্শ করবেন না।
যানবাহনে থাকলে: গাড়ির ভেতরে থাকা নিরাপদ, তবে ধাতব বডি স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন।
উন্নত বিশ্বে মোবাইলের মাধ্যমে ৩০ মিনিট আগেই বজ্রপাতের সতর্কতা দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং আবহাওয়া অধিদপ্তর আগাম বার্তা দেওয়ার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আধুনিকতা ও প্রযুক্তিনির্ভর পূর্বাভাস গ্রামীণ সুরক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
২০১৬ সালে বজ্রপাতকে 'জাতীয় দুর্যোগ' ঘোষণা করা হলেও এর প্রতিরোধে তালগাছ রোপণ ও বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের প্রকল্পগুলো আরও জোরালো করা প্রয়োজন। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে কৃষকদের জন্য 'মাল্টিপারপাস শেড' বা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ জীবন রক্ষায় বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।
আকাশে মেঘ জমলেই যেন আতঙ্ক নয়, বরং আমাদের ভেতর জেগে ওঠে সচেতনতার বোধ। বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা আর ব্যক্তিগত সতর্কতাই পারে এই প্রাকৃতিক ঘাতকের হাত থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে।
জান্নাত/সকালবেলা
| আজকের তারিখঃ বঙ্গাব্দ