নিজেস্ব প্রতিবেদক: দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে অভ্যন্তরীণ নৌপথে লঞ্চের ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থা। তারা যাত্রীদের ভাড়া ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে গত রবিবার বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে (বিআইডব্লিউটিএ) চিঠি পাঠিয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। তার মধ্যেই বরিশাল-ঢাকা নৌপথে চলাচলকারী লঞ্চের ভাড়া ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে নিচ্ছেন লঞ্চ মালিকরা। গত সোমবার (২০ এপ্রিল) থেকে যাত্রীদের কাছ থেকে বর্ধিত ভাড়া আদায় করছেন তারা।
লঞ্চ মালিক, কর্মচারী ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তেলের দাম বাড়ার আগে লঞ্চের ডেকের ভাড়া ছিল ৩০০ টাকা, গত সোমবার থেকে ৩৫০ টাকা করে যাত্রীদের কাছ থেকে নিচ্ছেন লঞ্চ মালিকরা। একইভাবে সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া ছিল এক হাজার টাকা, তা ২০০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ২০০ টাকা নিচ্ছেন। ডাবল কেবিনের ভাড়া ছিল ২ হাজার টাকা। বর্তমানে নেওয়া হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ টাকা। এভাবে ফ্যামিলি ও সৌখিন কেবিন থেকে শুরু করে সেমি-ভিআইপি ও ভিআইপি কেবিনের ৬০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি নেওয়া হচ্ছে। সরকারি সিদ্ধান্তের আগে এভাবে ভাড়া আদায় করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা।
বরিশাল থেকে ঢাকাগামী সুন্দরবন লঞ্চের ডেকের যাত্রী আব্দুস সবুর বলেন, ‘এটা তো এদেশের নিয়মে পরিণত হয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্তের আগেই ৩৫০ টাকা করে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। আমরাও দিতে বাধ্য হচ্ছি। রাজনৈতিক নেতা বলেন আর সরকার, কেউ দেশের সাধারণ মানুষের কথা ভাবে না। আগে ডেকের ভাড়া ৩০০ টাকা নেওয়া হতো, তাতেও লঞ্চ মালিকদের লাভ হতো। এখন তেলের দাম বাড়ায় আমাদের মাথায় অতিরিক্ত ভাড়া তুলে দিলো।’ একই কষ্টের কথা বললেন ডেকের যাত্রী রহিম শেখ, রাজ্জাক মৃধা, মনোজসহ একাধিক যাত্রী। তারা জানিয়েছেন, ডেকে আমাদের মতো সাধারণ লোকজন যাতায়াত করে। ৫০ টাকা অনেক বেশি বাড়ানো হয়েছে।
লঞ্চের কেবিনের যাত্রী ঢাকার ব্যবসায়ী লুৎফর রহমান বলেন, ‘সড়কের চেয়ে নিরাপদ যাত্রা হওয়ায় লঞ্চে ঢাকা-বরিশাল যাতায়াত করে থাকি। মঙ্গলবার রাতে ফ্যামিলিসহ ঢাকায় যেতে ডাবল কেবিনের ভাড়া নিয়েছে ২ হাজার ৪০০ টাকা। কারণ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ভাড়া বেশি গুনতে হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সব কিছুরই দাম বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি চাপ পড়ছে আমাদের ওপর।’ এ ব্যাপারে সুরভী লঞ্চের মালিক রেজিন উল কবির বলেন, ‘সরকারের পূর্ব নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অনেক কম নেওয়া হচ্ছে। ডেকের ভাড়া ৫০ আর কেবিনে যে ২০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে, তা পূর্বের নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও কম। গত রবিবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর নৌপথে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বাড়াতে সরকারকে চিঠি দিয়েছেন লঞ্চমালিকরা। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে মালিকপক্ষের।’
প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা এবং পেট্রোলের দাম ১১৬ থেকে বাড়িয়ে ৩৩৫ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। নতুন দাম গত রবিবার থেকে কার্যকর হয়েছে। লঞ্চমালিকদের প্রস্তাব অনুযায়ী, যাত্রীভাড়া ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্বে প্রতি কিলোমিটারে ১ টাকা বাড়িয়ে ৩ টাকা ৭৭ পয়সা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। আর ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে প্রতি কিলোমিটারে বর্তমান ১ টাকা বাড়িয়ে ৩ টাকা ৩৮ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সর্বনিম্ন যাত্রীভাড়া ২৯ টাকার পরিবর্তে ৩৫ টাকা নির্ধারণের অনুরোধ করা হয়েছে।
এদিকে ঢাকা-চাঁদপুর লঞ্চে আগের ভাড়াই নেওয়া হচ্ছে। সরকারি সিদ্ধান্ত না আসায় এখনও ভাড়া বাড়ানো হয়নি বলে জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। এ রুটে ডেকের ভাড়া ১৮০ টাকা, সাধারণ চেয়ার ২৫০, প্রথম শ্রেণি ৩৫০, সিঙ্গেল কেবিন ৭০০ এবং ডাবল কেবিনের ভাড়া ১ হাজার ৪০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ লঞ্চঘাট থেকে ছয়টি নৌপথে চলাচলকারী ৩৩টি লঞ্চেও এখন পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো হয়নি। নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের পরিদর্শক মো. সেলিম মিয়া জানান, ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত আসেনি। কবে নাগাদ বাড়বে সেটি মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হবে।
আই.এ/সকালবেলা