গাজা পুনর্গঠনে যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিউ গাজা’ মাস্টারপ্ল্যান উন্মোচন
বিধ্বস্ত গাজা উপত্যকাকে একেবারে নতুন করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা উন্মোচন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ‘নিউ গাজা’ নামের এই পরিকল্পনায় ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে ডজন ডজন আকাশচুম্বী অট্টালিকা, আধুনিক আবাসন প্রকল্প এবং পর্যটন কেন্দ্র গড়ার কথা বলা হয়েছে।
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নবগঠিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে এই মহাপরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যান উপস্থাপন করা হয়। দুই বছর ধরে চলা ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ বন্ধ এবং পুনর্গঠন তদারকির জন্য এই বোর্ড গঠন করেছেন ট্রাম্প।
পরিকল্পনাটি তুলে ধরে ট্রাম্প বলেন, গাজায় আমরা সফল হতে যাচ্ছি। এটা হবে দেখার মতো চমৎকার একটি বিষয়। আমি হৃদয়ে একজন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী, আর ব্যবসার মূল বিষয় হলো এর অবস্থান। সমুদ্রের ধারের এই সুন্দর জায়গাটি দেখুন—এটি কত মানুষের জন্য কী হতে পারে, ভেবে দেখুন।
যুক্তরাষ্ট্রের এই মাস্টারপ্ল্যানে গাজার ২১ লাখ জনসংখ্যার জন্য আবাসিক, কৃষি ও শিল্প এলাকা গড়ে তোলার রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। উপকূলীয় পর্যটন জোনের জন্য ১৮০টি সুউচ্চ টাওয়ার ব্লক রাখা হয়েছে। পাশাপাশি থাকবে ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স, ডাটা সেন্টার, উন্নত ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট এবং বড় পার্ক ও খেলার মাঠ।
মিসর সীমান্তের কাছে একটি নতুন সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর তৈরির পরিকল্পনাও এতে রয়েছে। মিসর ও ইসরায়েল সীমান্তের সংযোগস্থলে একটি ত্রিপক্ষীয় ক্রসিং স্থাপন করা হবে। পুরো পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যা রাফাহ থেকে শুরু হয়ে পর্যায়ক্রমে গাজা শহরের উত্তর দিকে অগ্রসর হবে।
পরিকল্পনায় ‘নিউ রাফাহ’ অংশে এক লাখের বেশি স্থায়ী ঘরবাড়ি, ২০০টি শিক্ষাকেন্দ্র এবং ৭৫টি চিকিৎসাকেন্দ্র নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার জানান, দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে ‘নিউ রাফাহ’র নির্মাণকাজ শেষ করা সম্ভব।
নিরাপত্তা ও নিরস্ত্রীকরণ প্রসঙ্গে মানচিত্রে দেখা গেছে, মিসর ও ইসরায়েল সীমান্ত বরাবর একটি খালি ভূখণ্ড রাখা হয়েছে। এটি ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার নিরাপত্তা বেষ্টনী, যেখানে গাজা পুরোপুরি নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী অবস্থান করবে।
জ্যারেড কুশনার বলেন, গাজায় ৯ কোটি কেজি গোলাবারুদ ফেলা হয়েছে এবং ৬০ মিলিয়ন টন ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতে হবে। হামাস নিরস্ত্রীকরণের চুক্তিতে সই করেছে এবং সেটিই কার্যকর করা হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কেউ বিনিয়োগ করবে না।
হামাসকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে ট্রাম্প বলেন, তাদের অবশ্যই অস্ত্র ছেড়ে দিতে হবে। তা না হলে তাদের শেষ দেখে ছাড়া হবে। একই সঙ্গে গাজায় থাকা শেষ ইসরায়েলি জিম্মির মরদেহ হস্তান্তরের বিষয়েও তিনি জোর দেন।
অক্টোবরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি এখনও ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত তিন মাসে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪৭৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, জাতিসংঘ জানায়, গাজায় প্রায় ১০ লাখ মানুষের পর্যাপ্ত আশ্রয় নেই এবং ১৬ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছেন।
ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ ট্রাম্পের উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, আসল পরীক্ষা হবে হামাস গাজা ছাড়লে। অপরদিকে, ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস শান্তি পরিকল্পনার পূর্ণ বাস্তবায়ন ও ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের দাবি জানান।
এদিকে গাজার নবগঠিত টেকনোক্র্যাট সরকার ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি)-এর প্রধান আলী শাথ ঘোষণা করেছেন, আগামী সপ্তাহে রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং খুলে দেওয়া হবে, যা ২০২৪ সালের মে মাস থেকে বন্ধ ছিল।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজার ৫৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
আই.এ/সকালবেলা