নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, পুলিশ বাহিনীকে যেভাবে সংস্কার করতে চেয়েছিলাম, বাস্তবে সেভাবে তা হয়ে ওঠেনি। রোববার (১৮ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন’ শীর্ষক নীতি সংলাপে তিনি এ মন্তব্য করেন। একই সময়ে পুলিশের ওপর মব-সন্ত্রাস ও ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় বাহিনীর মনোবল ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সংস্কারের প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা সংলাপে দেওয়া বক্তব্যে আসিফ নজরুল বলেন, “সংস্কার নিয়ে কিছু মানুষের নেতিবাচক প্রচারণা অনেকটা উদ্দীপকের মতো কাজ করে, যা দিয়ে বাড়তি ভিউ পাওয়া যায়। তবে কোনো সংস্কার হয়নি—একথা ঠিক নয়। যদি আমাদের প্রত্যাশা ১০ থাকে, তবে অন্তত ৪ তো অর্জিত হয়েছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়নের সময় যেভাবে সবার সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছিল, পুলিশ সংস্কারের ক্ষেত্রেও সরকার সবার সঙ্গে সেভাবেই পরামর্শ করছে। তবে কাঠামোগত ও আচরণগত পরিবর্তনের যে লক্ষ্য ছিল, তা অর্জনে এখনো চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
রক্তাক্ত পুলিশ: মব-সন্ত্রাসের ভয়াবহ চিত্র সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হামলার শিকার হয়েছে পুলিশ। গত এক বছরের (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অন্তত ৬০১ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এর মধ্যে গুরুতর জখম হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কয়েকজনের মৃত্যুও হয়েছে। মূলত মাঠপর্যায়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, হত্যা মামলার আসামি গ্রেপ্তার এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক বিরোধ মেটাতে গিয়ে পুলিশ সদস্যরা উচ্ছৃঙ্খল জনতার দলবদ্ধ হামলার শিকার হচ্ছেন।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের অক্টোবর মাসে সর্বোচ্চ ৬৯ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এছাড়া মে মাসে ৬২ জন এবং এপ্রিলে ৫২ জন হামলার শিকার হন। মহানগরগুলোর মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) আহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি (৮৯ জন)। অতিসম্প্রতি ময়মনসিংহে আসামি ধরতে গিয়ে পাঁচ পুলিশ সদস্য ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর জখম হন।
আসামি ছিনতাই ও আইনহীনতার ঝুঁকি প্রতিবেদনে দেখা যায়, পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে হাতকড়াসহ আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গত এক বছরে সারা দেশে ৪৪টির বেশি হামলার ঘটনায় অন্তত ৪১ জন আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার তথ্য মিলেছে। কেবল জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসেই ১০ জন আসামিকে পুলিশের হেফাজত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলছেন, পুলিশের ওপর এভাবে হামলা চলতে থাকলে এবং তাদের কার্যক্রম অচল হয়ে পড়লে সাধারণ মানুষকে নিজেদের ঘরবাড়ি নিজেদেরই পাহারা দিতে হবে।
বাহিনীকে পুনর্গঠনের চেষ্টা বিগত সরকারের আমলে অপকর্মে জড়িত থাকা পুলিশ সদস্যদের কেউ কেউ আত্মগোপনে আছেন, আবার অনেককে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অনেক কর্মকর্তাকে ওএসডি, বাধ্যতামূলক অবসর কিংবা চাকরিচ্যুত করার মাধ্যমে বাহিনীকে শুদ্ধ করার প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশ সদরদপ্তর ও সরকার ইতিমধ্যে আন্দোলনে নিহত পুলিশ সদস্যদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা এবং আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুলিশ বাহিনীকেই মূল দায়িত্ব পালন করতে হবে, তাই মহানগর ও জেলা পর্যায়ের পুলিশ প্রধানরা মাঠপর্যায়ে সদস্যদের মনোবল ফেরাতে নিয়মিত মতবিনিময় করছেন। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম এ বিষয়ে বলেন, “আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে পুলিশ বিভিন্ন জায়গায় হামলার শিকার হচ্ছে। পুলিশকে পুনরায় কর্মক্ষম ও গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা চলছে। এক্ষেত্রে নাগরিক সমাজকে পুলিশের পাশে দাঁড়াতে হবে।”
সরকার পুলিশ বাহিনীকে উন্নত দেশের আদলে গড়ে তুলতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ে হামলা বন্ধ না হলে এই সংস্কার প্রক্রিয়া সফল হওয়া কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।