রূপপুর ও সাহাপুরের বদলে যাওয়া গল্প

রূপপুর ও সাহাপুরের বদলে যাওয়া গল্প

সেলিম সরদার, ঈশ্বরদী (পাবনা): একসময়ের ঝোপঝাড় আর অন্ধকারাচ্ছন্ন সাহাপুর গ্রাম এখন আলো ঝলমলে এক আধুনিক জনপদ। পাবনার ঈশ্বরদীতে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ছোঁয়ায় পাল্টে গেছে পুরো এলাকার দৃশ্যপট। যে বালুচরে দিনের বেলাতেও মানুষ যেতে ভয় পেত, সেখানে এখন হাজার হাজার মানুষের পদভারে মুখরিত এক ব্যস্ত শহর।

গ্রিন সিটি ও আধুনিক জীবনযাত্রা: রূপপুর প্রকল্পের পাশেই সাহাপুর গ্রামে গড়ে উঠেছে আধুনিক ২০ তলা ভবনবিশিষ্ট ‘গ্রিন সিটি’। এখানে বসবাস করছেন প্রায় পাঁচ হাজার বিদেশি প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা। সাহাপুরের নতুন হাট এলাকায় এখন বহুতল ভবন, আধুনিক শপিং মল আর উন্নত রেস্তোরাঁর সমাহার। গতকাল মঙ্গলবার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা এই এলাকার গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

অর্থনৈতিক বিপ্লব: প্রকল্পের কারণে স্থানীয় মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেছে দ্রুতগতিতে। কয়েক বছর আগে যারা দিনমজুরি করতেন, তারা এখন প্রকল্পে কাজ করে বা ছোটখাটো ব্যবসা করে সচ্ছল। ঈশ্বরদীর গ্রামগুলোতে এখন আর কাঁচা বাড়ি চোখে পড়ে না; বরং ইটের দালান, এসি আর দামী মোটরসাইকেল এখন সাধারণ চিত্র। শখের বশে এখন স্থানীয়রা চাইনিজ রেস্তোরাঁয় গিয়ে বিদেশি খাবারের স্বাদ নিচ্ছেন।

আকাশচুম্বী জমির দাম ও আবাসন ব্যবসা: রূপপুর প্রকল্পের আগে ঈশ্বরদীর জমি বিঘা হিসেবে বিক্রি হতো, যা এখন শতাংশে এসে ঠেকেছে। বিঘা প্রতি ৩০-৪০ হাজার টাকার জমি এখন শতাংশ প্রতি এক থেকে দুই লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বাড়ি ভাড়া দিয়ে মাসে ১০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। সাহাপুর গ্রামের জুলমত হায়দার জানান, বাড়ি ভাড়া থেকেই তার মাসিক আয় এখন প্রায় ৫৫ হাজার টাকা।

ব্যবসার ধরনে পরিবর্তন: কৃষিনির্ভর আয়ের পথ বদলে এখন মানুষ হোটেল, রেস্তোরাঁ ও সুপারশপের ব্যবসায় ঝুঁকছে। রুশ নাগরিকদের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে এলাকায় গড়ে উঠেছে চারটি রিসোর্ট, ১৫টি বেসরকারি হাসপাতাল ও অসংখ্য সুপারমল। দোকানের সাইনবোর্ডগুলোতে এখন বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি শোভা পাচ্ছে রুশ ভাষা।

সংস্কৃতির মেলবন্ধন: সাহাপুরের ‘নতুন হাট’ এখন আর সপ্তাহে দুই দিনের হাট নেই; এটি এখন প্রতিদিনের ব্যস্ত বাজার। রুশদের সাথে মেলামেশার ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এখন রুশ ভাষা রপ্ত করে ফেলেছেন। সবজি বিক্রেতা জহুরুল আলম জানান, লেখাপড়া না জানলেও এখন তিনি অনায়াসেই রুশ ভাষায় পর্যটকদের কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারেন। এই অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন রূপপুর ও সাহাপুরকে এক অন্ধকার গ্রাম থেকে আধুনিক ‘গ্রিন সিটি’তে রূপান্তরিত করেছে।

জান্নাত/সকালবেলা

মন্তব্য করুন