দৌলতদিয়া ট্র্যাজেডি: নিয়মের অবহেলায় মরণফাঁদ পদ্মা

দৌলতদিয়া ট্র্যাজেডি: নিয়মের অবহেলায় মরণফাঁদ পদ্মা

নিজস্ব প্রতিবেদক, দৌলতদিয়া: ফেরিতে ওঠার আগে যাত্রীবাহী যানবাহন থেকে যাত্রী নামানো বাধ্যতামূলক—সরকারি এই স্পষ্ট নির্দেশনা কেবল নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ। 

গত ২৫ মার্চ বিকেলে দৌলতদিয়া ঘাটে 'সৌহার্দ্য পরিবহন'-এর একটি বাস ২৬ জন যাত্রীসহ পদ্মা নদীতে তলিয়ে যাওয়ার পর বেরিয়ে আসছে নৌ-নিরাপত্তা বিধির চরম লঙ্ঘনের ভয়াবহ চিত্র। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পন্টুনে রেলিং না থাকা, অ্যাপ্রোচ সড়কের ভগ্নদশা এবং বিআইডব্লিউটিএ-র সীমাহীন তদারকিহীনতাই এই মর্মান্তিক 'হত্যাকাণ্ডের' মূল কারণ।

নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুযায়ী, ফেরিতে ওঠার আগে বাস থেকে সকল যাত্রীকে নামিয়ে দেওয়া এবং ফেরি পুরোপুরি আনলোড হওয়ার পর নতুন যানবাহন ওঠার নিয়ম থাকলেও দৌলতদিয়া ঘাটে এর কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ঘাট প্রস্তুত না থাকায় এবং অ্যাপ্রোচ সড়কে বড় গর্ত ও উঁচু ঢিবির কারণে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি গভীর নদীতে পড়ে যায়। চোখের পলকে পদ্মা গ্রাস করে নেয় ২৬টি তাজা প্রাণ। অথচ নিয়ম মানা হলে হয়তো বাসের ভেতরে এভাবে প্রাণহানির ঘটনা ঘটত না।

দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা উদ্ধার তৎপরতা শুরু করলেও বিআইডব্লিউটিএ-র কর্মকর্তাদের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। অভিযোগ উঠেছে, পাশে থাকা উদ্ধারকারী জাহাজ 'হামজা'কে তাৎক্ষণিকভাবে কাজে লাগানো হয়নি এবং অন্যান্য সংস্থাকে সহযোগিতায় তাদের অনীহা ছিল স্পষ্ট। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, ২০১৯ সালে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাট আধুনিকায়নের জন্য ১,৩৫১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও গত ৭ বছরেও কোনো দৃশ্যমান কাজ হয়নি। অথচ নথিপত্রে ইতিমধ্যে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, পন্টুনে একটি সামান্য রেলিং বা জরুরি স্টপার বসানোর টাকা কি তবে দুর্নীতির পকেটে গেছে?

বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে ত্রুটির কথা স্বীকার করে পন্টুনে দ্রুত রেলিং বসানোর আশ্বাস দিলেও নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কোনো সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সরকার দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করলেও জনমনে প্রবল সংশয়—এই প্রতিবেদন কি আসলেও দোষীদের চিহ্নিত করবে, নাকি অতীতের মতো ফাইলবন্দি হয়ে ধামাচাপা পড়ে যাবে?

নিহতদের পরিবারের আহাজারিতে পদ্মার পাড় এখন ভারী। স্থানীয়দের দাবি, এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, বরং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড। তারা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি দায়ী কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ঘাটগুলোতে অবিলম্বে আধুনিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

মন্তব্য করুন