চীনের শায়ানসি প্রদেশের সিতিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ‘সান চেজিং’ বা ‘জুরি’ নামক একটি বিশেষ প্রকল্পের আওতায় এই তারবিহীন বিদ্যুৎ পরিবহন ব্যবস্থাটি তৈরি করেছেন। এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মূল বিশেষত্ব হলো, এটি একই সময়ে একাধিক চলমান লক্ষ্যবস্তুকে চিহ্নিত করে সেটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে।
গবেষণাগারে চালানো সাম্প্রতিক এক পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা প্রায় ১০০ মিটার দূরত্বে কোনো রকম তার ছাড়াই সফলভাবে বিদ্যুৎ পাঠাতে সক্ষম হয়েছেন। এই প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ পরিবহনের কর্মদক্ষতা ছিল ২০ দশমিক ৮ শতাংশ এবং এর মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১ হাজার ১৮০ ওয়াট শক্তি সরবরাহ করা গেছে।
বিজ্ঞানীরা এই প্রযুক্তিটি কেবল স্থির কোনো যন্ত্রের ওপর নয়, বরং আকাশে উড়তে থাকা ড্রোনের ওপরও সফলভাবে পরীক্ষা করেছেন। গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার গতিতে উড়তে থাকা একটি ড্রোনকে ৩০ মিটার দূর থেকে অত্যন্ত স্থিতিশীলভাবে ১৪৩ ওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা গেছে। বিশেষজ্ঞরা একটি গণমাধ্যমকে জানান, এই প্রযুক্তি সফল হলে ভবিষ্যতে আকাশে উড়ন্ত ড্রোন বা মহাকাশযানকে মাঝ আকাশেই তারবিহীনভাবে চার্জ দেওয়া সম্ভব হবে।
গবেষকদের মূল পরিকল্পনা হলো, পৃথিবীর কক্ষপথে বিশাল এক সৌরপ্যানেলের বহর বা মহাকাশ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা। এই প্যানেলগুলো মহাকাশে সরাসরি সূর্যের আলো থেকে বিপুল পরিমাণ শক্তি সংগ্রহ করবে। পরবর্তীতে সেই সংগৃহীত শক্তিকে লেজার বা শক্তিশালী মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তির মাধ্যমে পৃথিবী কিংবা মহাকাশে থাকা অন্যান্য স্যাটেলাইটে পাঠানো হবে।
বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো দিন-রাতের চক্র এবং মেঘ-বৃষ্টিসহ আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা। কিন্তু মহাকাশে কোনো বায়ুমণ্ডল না থাকায় সেখানে স্থাপিত সৌরপ্যানেলগুলো প্রায় ২৪ ঘণ্টাই নিরবচ্ছিন্নভাবে সূর্যের আলো পাবে। ফলে সেখানে উৎপাদিত বিদ্যুৎ হবে অনেক বেশি স্থিতিশীল ও সাশ্রয়ী।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে এই ‘জুরি’ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। এরপর ২০২২ সালের জুনে গবেষক দলটি মহাকাশ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ভূমিভিত্তিক পরীক্ষামূলক যাচাই ব্যবস্থা সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়। বর্তমানে এই প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে আরও দীর্ঘ দূরত্বে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও তা নিরাপদে পরিবহনের প্রযুক্তি উন্নয়নের কাজ চলছে।
গবেষকেরা গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ইতিমধ্যেই তারা সৌরশক্তি সংগ্রহ ও তা রূপান্তরের ক্ষমতা বাড়ানো, মাইক্রোওয়েভ বিম আরও নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং অ্যান্টেনাকে আকারে ছোট ও হালকা করার মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অর্জন করেছেন।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রজেক্ট পুরোপুরি সফল হলে ভবিষ্যতে শুধু পৃথিবীতেই নয়, মানুষের পরিকল্পিত চাঁদের বসতি কিংবা মহাকাশ স্টেশনেও বিদ্যুৎ সরবরাহ অনেক সহজ হয়ে যাবে। তবে প্রযুক্তিটি এখনো প্রাথমিক পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। বড় পরিসরে এর বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু করতে হলে বিদ্যুৎ পরিবহনের দক্ষতা বৃদ্ধি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর মতো চ্যালেঞ্জগুলো পার হতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জান্নাত সকালাবেলা