টঙ্গীর মাদরাসায় ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় পাল্টাপাল্টি মামলা
গাজীপুরের টঙ্গীতে সাত বছর বয়সী এক কোমলমতি শিশু ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষককে পুলিশ গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করলেও ঘটনাটি নতুন মোড় নিয়েছে। অভিযুক্ত শিক্ষককে মারধর, মাদরাসার প্রশাসনিক কার্যালয়ে ভাঙচুর চালানো এবং ১৭ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার পাল্টা অভিযোগে ভুক্তভোগী শিশুটির বাবাসহ ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা দায়ের করেছে সংশ্লিষ্ট মাদরাসা কর্তৃপক্ষ।
আজ শনিবার (২৪ অক্টোবর) দুপুরে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের পাল্টা মামলার তথ্য গণমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন গাজীপুরের টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) গভীর রাতে টঙ্গী পশ্চিম থানায় মামলাটি দায়ের করেন 'ক্বারিউল কোরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসা'র প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ মাওলানা ক্বারী মোহাম্মদ আলমাস হোসেন। মামলায় নির্যাতিত ছাত্রীর বাবাসহ মোট ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মাদরাসার এজাহারে দাবি করা হয়, খণ্ডকালীন শিক্ষক মুসলেউদ্দিনের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলে তাঁকে কার্যালয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাপ্রহরীকে প্রহার, দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে চরম অশালীন আচরণ, আসবাবপত্র ভাঙচুর এবং প্রতিষ্ঠানের জমি কেনার উদ্দেশ্যে ক্যাশে গচ্ছিত রাখা নগদ ১৭ লাখ টাকা জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে অধ্যক্ষ ক্বারী মোহাম্মদ আলমাস হোসেন বলেন, “অভিযুক্ত মুসলেউদ্দিন প্রতিদিন মাত্র তিন ঘণ্টা করে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে ক্লাস নিতেন। তাঁকে উপাধ্যক্ষ হিসেবে ভুল পরিচয় দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুৎসা ছড়ানো হচ্ছে। মূল উপাধ্যক্ষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ছুটিতে ছিলেন। এই ফাঁকে বহিরাগতদের উসকানি দিয়ে পরিকল্পিতভাবে মাদরাসায় হামলা চালানো হয়। আমাদের কাছে ১৭ লাখ টাকা লুটের সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত হোক, তবে অভিযোগকে কেন্দ্র করে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে শিক্ষককে পিটিয়ে রক্তাক্ত করা এবং দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে তাণ্ডব চালানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
অন্যদিকে, শিশুটির পরিবারের দায়ের করা পূর্বের যৌন নিপীড়ন মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষক মুসলেউদ্দিনকে আগেই গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠিয়েছে পুলিশ। তবে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের এই নতুন ও অলীক মামলার পর চরম বিস্ময় প্রকাশ করে ঘটনার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা। একই সঙ্গে তিনি পরিবার ও নিজের নিরাপত্তার পাশাপাশি কন্যাশিশুর ওপর সংঘটিত অন্যায়ের বিচার চেয়েছেন।
শুক্রবার রাতে গণমাধ্যমকর্মীদের মুখোমুখি হয়ে ক্ষুব্ধ বাবা বলেন, “আমি আমার অবোধ সন্তানের ওপর হওয়া জুলুমের বিচার চাইতে মাদরাসায় গিয়েছিলাম, কোনো 'মব' বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে নয়। তারা দাবি করছে আমি নাকি মব সৃষ্টি করেছি এবং ফ্ল্যাট দখল করতে গিয়েছি! একজন বাবা হিসেবে সন্তানের সাথে ঘটে যাওয়া নির্মমতার বিচার চাওয়া কি অপরাধ? আমি অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ভাঙচুর করিনি। সেখানে কেবল একটি কাচের গ্লাস ভুলবশত ভেঙেছিল, যার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথাও আমি তৎক্ষণাৎ জানিয়েছিলাম।”
১৭ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার বিচিত্র অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তিনি জোর দাবি জানিয়ে বলেন, “আমি কোথায় ১৭ লাখ টাকা নিয়ে গেলাম, তা মাদরাসার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ (CCTV) দেখে পুলিশ ও সাংবাদিকরা যাচাই করুন। এছাড়া একটি মাদরাসায় ক্যাশে নগদ এত টাকা কেন রাখা হয়েছিল, সেই বিষয়টিরও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। আমার বিরুদ্ধে যেসব মনগড়া অভিযোগ তোলা হচ্ছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। ঘটনার তিন দিন আগেই আমি অধ্যক্ষকে লিখিত ও মৌখিকভাবে বিষয়টি জানিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।”
তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলেন, “আমি আমার মেয়েকে দ্বীনি শিক্ষার জন্যই ওই মাদরাসায় ভর্তি করেছিলাম। আমি কোনোভাবেই ইসলাম বা প্রকৃত আলেম-ওলামাদের বিরুদ্ধে নই। তবে যারা পবিত্র ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে শিশুদের ওপর অপরাধ করে এবং সত্য আড়াল করতে পাল্টা নাটক সাজায়, আমি তাদের বিরুদ্ধেই কথা বলছি। আইন যদি আমাকে অপরাধী মনে করে তবে বিচার মাথা পেতে নেব, কিন্তু আমার শিশুর সাথে ঘটে যাওয়া অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।”
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, বিগত কয়েকদিন ধরে সাত বছরের মেয়েটি মাদরাসায় যেতে ভয় পাচ্ছিল। কারণ জানতে চাইলে সে তার পরিবারের কাছে সহকারী প্রধান শিক্ষক মুসলেউদ্দিনের কুরুচিপূর্ণ যৌন নিপীড়নের বিস্তারিত বর্ণনা দেয়। বিষয়টি জানার পর গত বুধবার (২১ অক্টোবর) দুপুরে স্বজনরা টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকার শফিউদ্দিন সরকার একাডেমি রোডের ওই মাদরাসায় গিয়ে শিক্ষকের মুখোমুখি হন। একপর্যায়ে খবর ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজিত স্থানীয় জনতা ও স্বজনরা অভিযুক্ত শিক্ষককে গণধোলাই দেয়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে শিক্ষককে আটক করে এবং বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে পাঠায়। পরবর্তীতে মারধরের ভিডিও সোশ্যালে ছড়িয়ে পড়লে পাল্টাপাল্টি আলোচনা শুরু হয়।
সার্বিক বিষয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান জানান, “শিশু নির্যাতনের মামলায় এক শিক্ষক বর্তমানে কারাগারে আটক রয়েছেন। পরবর্তীতে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের করা পাল্টা মামলায় ছাত্রীর বাবাসহ অন্য আসামিদের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। উভয় পক্ষই হুমকি-ধামকির অভিযোগ এনেছে। পুলিশ গভীর নিরপেক্ষতার সাথে পুরো বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”