প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিবের সহকারী পরিচয়ে প্রতারণা: নাটোরে গ্রেপ্তার সাবেক ছাত্রলীগ নেতা
হোয়াটসঅ্যাপ এবং মোবাইল ব্যাংকিং মাধ্যম বিকাশ, নগদ ও রকেটের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নাম ভাঙিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে নাটোর জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এক অভিনব প্রতারককে গ্রেপ্তার করেছে।
গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির নাম আবু হুরায়রা (৩০)। তিনি নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার বালুয়া-বাসুয়া গ্রামের জিয়াউদ্দিনের সন্তান। আজ শনিবার (২৪ অক্টোবর) দুপুর ১টায় নাটোর জেলা পুলিশ সুপারের সভাকক্ষে আয়োজিত এক জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে নাটোরের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. শরিফুল হক গণমাধ্যমকে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেন।
পুলিশের দেওয়া তথ্য ও প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃত আবু হুরায়রা ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সিংড়া পৌর ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদের দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ বেতার রংপুরে রেডিও টেকনিশিয়ান পদে সরকারি চাকরিতে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু সেখানে অবস্থানকালেই একই রকম অনলাইন ও রাজনৈতিক প্রতারণার অপরাধে তিনি সরকারি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত হন। তাঁর বিরুদ্ধে পূর্বেরও একাধিক ডিজিটাল নিরাপত্তা, সাইবার সুরক্ষা আইন এবং জালিয়াতির মামলা রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে আবু হুরায়রা ও তাঁর চক্রের সঙ্গীরা দেশের বিভিন্ন জেলার রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, পেশাজীবী ও সুশীল সমাজের ব্যক্তিদের সাথে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ স্থাপন করতেন। যোগাযোগের সময় আবু হুরায়রা নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব মো. আতিকুর রহমান রুমনের বিশ্বস্ত 'অফিস স্টাফ' হিসেবে পরিচয় দিতেন।
এই ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে তারা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সরকারি বড় বড় সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দেওয়া, কিংবা বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় কমিটিতে পদায়ন ও জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিশেষ ‘আবেদন ফরম’ পূরণের নামে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি ও আদায় করতেন।
অনলাইন এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রবীণ সাংবাদিক কাদের গণি চৌধুরী। জানা গেছে, গত ১৯ অক্টোবর বিকেল ৩টা ১১ মিনিটে আবু হুরায়রা ও তার সহযোগীরা তাদের ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ থেকে কাদের গণি চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করেন। এ সময় তারা নিজেদের প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিবের ব্যক্তিগত স্টাফ দাবি করে বিএনপির মনোনীত রাজনৈতিক পদে নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য একটি ফরম পূরণের কথা বলে কৌশলে টাকা আদায় করে নেন।
একইভাবে দেশের একজন প্রখ্যাত ব্যারিস্টারকে একই পরিচয় দিয়ে অনলাইনে ফর্ম পূরণের মাধ্যমে রাজনৈতিক পদে পদায়নের আশ্বাস দিয়ে বড় অংকের টাকা দাবি করা হয়।
বিষয়টি একপর্যায়ে ভুক্তভোগীদের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব মো. আতিকুর রহমান রুমন জানতে পারলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি উচ্চপর্যায়ে অবহিত করেন। পরবর্তীতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সরাসরি নির্দেশে নাটোরের পুলিশ সুপার মো. শরিফুল হকের দিকনির্দেশনায় নাটোর জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) একটি চৌকস দল আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে অভিযুক্তের সুনির্দিষ্ট অবস্থান চিহ্নিত করে। পরে সিংড়া উপজেলার নিজ বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আবু হুরায়রাকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়।
ঘটনাসম্পর্কে নাটোরের পুলিশ সুপার মো. শরিফুল হক জানান, “আসামির বিরুদ্ধে পূর্বেও সাইবার অপরাধের একাধিক সুস্পষ্ট ট্র্যাক রেকর্ড রয়েছে। চাকরি হারানোর পরও সে এই অপকর্ম চালিয়ে আসছিল। আটক প্রতারকের ব্যবহৃত মোবাইল হ্যান্ডসেট ও অ্যাকাউন্ট থেকে একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তির সাথে প্রতারণার তথ্যপ্রমাণ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এই চক্রের সাথে জড়িত অন্য সহযোগীদের সনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে ডিবি পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আসামির বিরুদ্ধে নতুন করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।”