বিএডিসির ডাল ও তৈলবীজ প্রকল্প: পথে নতুন অগ্রযাত্রা
অনক আলী হোসেন শাহিদী: দেশের খাদ্য, কৃষি ও পুষ্টি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) দীর্ঘদিন ধরে ডাল ও তৈলবীজ উৎপাদন, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং কৃষক পর্যায়ে বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। ১৯৮০ সালে যাত্রা শুরু করা বিএডিসির ডাল ও তৈলবীজ বিভাগের কার্যক্রম বর্তমানে আরও সম্প্রসারিত হয়েছে "ডাল ও তৈলবীজ উৎপাদনের মাধ্যমে টেকসই পুষ্টি নিরাপত্তা জোরদারকরণ প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়)" বাস্তবায়নের মাধ্যমে।
একনেকে অনুমোদিত এ প্রকল্পটি ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য গুণগত মানসম্পন্ন ডাল ও তৈলবীজ উৎপাদন, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও কৃষকদের মাঝে বিতরণের মাধ্যমে দেশের বীজের চাহিদা পূরণ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
প্রকল্পের আওতায় মোট ১৮ হাজার মেট্রিক টন গুণগত মানসম্পন্ন ডাল ও তৈলবীজ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে তিনটি ডাল ও তৈলবীজ খামার, তিনটি বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র এবং ১২টি চুক্তিবদ্ধ চাষী কেন্দ্রের মাধ্যমে দেশের ৮টি বিভাগের ৪২টি জেলা, দুটি সিটি কর্পোরেশন এবং ২০০টি উপজেলায় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ২৬৫ কোটি ৭৮ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রশাসনিক ও রাজস্ব খাতে ব্যয় ২৩৯ কোটি ৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকা এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে ব্যয় ২৩ কোটি ৯৮ লাখ ৬২ হাজার টাকা। সীমিত উন্নয়ন ব্যয় সত্ত্বেও বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রকল্পটি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী।
উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি
২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে চুক্তিবদ্ধ কৃষকদের মাধ্যমে ৩,৭২৩.১১২ মেট্রিক টন গুণগত মানসম্পন্ন ডাল ও তৈলবীজ উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে ডাল জাতীয় বীজ ১,৯১৫.৯৩১ মেট্রিক টন এবং তৈলবীজ ১,৮০৯.১৮১ মেট্রিক টন।
এই উৎপাদিত বীজ ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হবে। এসব উন্নতমানের বীজ ব্যবহার করে প্রায় ৬ লাখ একরেরও বেশি জমিতে চাষাবাদ সম্ভব হবে। এতে আনুমানিক ২ লাখ ৫৭ হাজার ২৭৫ মেট্রিক টন ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ২,৯৮৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
গুণগত মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহারের ফলে গড়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ফলন বৃদ্ধি পাওয়ায় অতিরিক্ত ৫১ হাজার ৪৫৫.০০৬ মেট্রিক টন ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫৯৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। ফলে প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে জাতীয় অর্থনীতিতে অতিরিক্ত প্রায় ৬০০ কোটি টাকা সরাসরি যুক্ত হবে এবং সংশ্লিষ্ট অর্থবছরে প্রায় আট গুণ টার্নওভার সৃষ্টি করবে।
২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে প্রকল্পের আওতায় মোট ৬৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
প্রকল্পটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রকল্প পরিচালক ড. মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট বিএডিসির ডাল ও তৈলবীজ বিভাগে যোগদান করেন। যোগদানের পরপরই তিনি প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়ন, পিইসি সভায় অনুমোদন এবং পরবর্তীতে একনেকে অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করেন। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে শুরু করে পিইসি ও একনেকে অনুমোদন, মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম সমন্বয়, চুক্তিবদ্ধ কৃষকদের সম্পৃক্তকরণ, বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণ ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসেন। তাঁর নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন, সমস্যা দ্রুত শনাক্ত ও সমাধানের উদ্যোগ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সময়মতো কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে প্রকল্পটি নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের পথে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও মাঠপর্যায়ের কৃষকদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার মাধ্যমে তিনি প্রকল্প বাস্তবায়নে একটি কার্যকর ও ফলপ্রসূ প্রশাসনিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বিএডিসির ডাল ও তৈলবীজ বিভাগের যুগ্মপরিচালক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।
বর্তমানে তাঁর নেতৃত্বে প্রকল্পের কার্যক্রম সুসংগঠিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। সময়মতো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে তিনি নিয়মিত মাঠপর্যায়ে তদারকি করছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সততা, স্বচ্ছতা ও পেশাগত দক্ষতার সমন্বয়ে তিনি প্রকল্প বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
মাঠ পর্যায়ে ইতিবাচক সাড়া
নিজস্ব অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকল্প এলাকার কৃষকদের মধ্যে ডাল ও তৈলবীজ উৎপাদনে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। কৃষকরা সরিষা, সয়াবিন, চিনাবাদাম, তিল ও সূর্যমুখীসহ বিভিন্ন তৈলবীজ এবং মসুর, মুগ, খেসারি, ছোলা, মাসকলাই, মটর ও ফেলন জাতীয় ডাল উৎপাদন করছেন।
কৃষকদের ভাষ্য, বিএডিসির সরবরাহকৃত গুণগত মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহারের ফলে উৎপাদন বাড়ছে, উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কমছে এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ার সুযোগও বাড়ছে।
প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ
প্রকল্পের আওতায় ২,০০০ জন চুক্তিবদ্ধ চাষীকে ডাল ও তৈলবীজের উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। পাশাপাশি চুক্তিবদ্ধ এলাকায় কৃষক-কৃষাণী ও কৃষিশ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এ প্রকল্প।
কেন এ প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে ডালের বার্ষিক চাহিদা ২৫ লাখ মেট্রিক টন, বিপরীতে উৎপাদন মাত্র ৯.৩৭ লাখ মেট্রিক টন। একইভাবে ভোজ্যতেলের বার্ষিক চাহিদা ২৪.৮২ লাখ মেট্রিক টন, অথচ উৎপাদন মাত্র ১০.৬৪ লাখ মেট্রিক টন। ফলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ডাল ও ভোজ্যতেল আমদানি করতে হয়, যার জন্য ব্যয় হয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।
এই আমদানি নির্ভরতা কমাতে উন্নত ও উচ্চফলনশীল গুণগত মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যেই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান মো: আজিজুল ইসলাম বলেন, "১৯৬১ সাল থেকে বিএডিসি দেশের কৃষি উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং সার, সেচ ও বীজ ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ডাল ও তৈলবীজ উৎপাদনের মাধ্যমে টেকসই পুষ্টি নিরাপত্তা জোরদারকরণ প্রকল্প দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মাঠ পর্যায়ে আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আন্তরিকতার সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছেন।"
কৃষি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. রাশিদা ফেরদৌস বলেন, "দেশের মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি মন্ত্রণালয় কৃষির টেকসই উন্নয়নে কাজ করছে এবং এ ক্ষেত্রে বিএডিসি অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। ডাল ও তৈলবীজ উৎপাদনের মাধ্যমে টেকসই পুষ্টি নিরাপত্তা জোরদারকরণ প্রকল্প দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। কৃষি মন্ত্রণালয় প্রকল্প বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।"
কৃষিমন্ত্রী মো. আমিন উর রশিদ বলেন, "শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশের কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বীজ, সার ও কৃষি প্রযুক্তির প্রসারে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও কৃষির আধুনিকায়ন, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, উন্নত বীজ ও সার সরবরাহ এবং কৃষকদের ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সেই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শন ও ৩১ দফা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে উন্নত ও জলবায়ু সহিষ্ণু বীজ উৎপাদনে সরকার কাজ করছে। বিএডিসির এই প্রকল্প বাস্তবায়নে কৃষি মন্ত্রণালয় সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করবে।"
প্রধানমন্ত্রীর কৃষি ও রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেন, "বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন দীর্ঘদিন ধরে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ডাল ও তৈলবীজ উৎপাদনের এই প্রকল্প দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমদানি নির্ভরতা কমাতে এবং কৃষকের আয় বাড়াতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে। সরকারের কৃষিবান্ধব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশ আরও শক্তিশালী খাদ্য নিরাপত্তার দিকে এগিয়ে যাবে।"
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডাল ও তৈলবীজ উৎপাদন বৃদ্ধি শুধু খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাই নিশ্চিত করবে না, একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, কৃষকের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জাতীয় অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে। বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিএডিসির "ডাল ও তৈলবীজ উৎপাদনের মাধ্যমে টেকসই পুষ্টি নিরাপত্তা জোরদারকরণ প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়)" দেশের কৃষি ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
এআইএল/সকালবেলা
|