নির্বাচনী রাজনীতির এক রহস্যময় প্রবাদ হলো—‘কার পাশা যে শেষ পর্যন্ত কার টেবিলে গিয়ে থামে, তা বোঝা বড় দায়।’ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল এই প্রবাদটিকেই যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিল। গত কয়েক মাস ধরে রাজপথ থেকে চায়ের আড্ডা—সর্বত্রই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তাদের সুশৃঙ্খল ক্যাডার ভিত্তিক সাংগঠনিক শক্তি, জনসভাগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় দাপুটে প্রচার দেখে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, এবার বোধহয় ‘দাঁড়িপাল্লা’র পালে বইছে বিজয়ের হাওয়া। কিন্তু ভোটের চূড়ান্ত হিসাব বলছে, রাজনীতির দাবার ছকে শেষ চালটি দিয়েছেন ভোটাররাই, যার ফলে ‘ধানের শীষ’ এখন একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় আসীন।
৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগহীন নির্বাচনী মাঠে বিএনপি ও জামায়াত ছিল প্রধান দুই শক্তি। নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতে জামায়াত যেভাবে নিজেদের ‘ক্লিন ইমেজ’ ও সংস্কারের রূপরেখা নিয়ে হাজির হয়েছিল, তাতে মনে হয়েছিল তারা ক্ষমতার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। এমনকি বিভিন্ন জরিপ ও সোশ্যাল মিডিয়া পোলগুলোতে জামায়াতের এগিয়ে থাকার খবর ছড়িয়ে পড়ায় রাজনৈতিক মহলে জামায়াত সরকার গঠনের এক জোরালো গুঞ্জন উঠেছিল। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে ভোটাররা হয়তো পুরোনো ধারার রাজনীতির বাইরে কোনো নতুন শক্তিকে বেছে নেবেন।
কিন্তু ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের আবেগ এখনো অটুট। জামায়াত তাদের অতীতের তুলনায় রেকর্ড সংখ্যক (প্রায় ৬৮-৭৫টি) আসন পেয়ে রেকর্ড গড়লেও, ২১২টি আসনে জয় পেয়ে বিএনপি প্রমাণ করেছে যে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এখনো তাদেরকেই মূল স্তম্ভ হিসেবে মানে।
কেন জামায়াতের এই ‘ক্ষমতায় আসার গুঞ্জন’ পূর্ণতা পেল না? বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত নিজেদের ভোটব্যাংক বাড়াতে পারলেও বিএনপির বিশাল কর্মী বাহিনী এবং জেলা পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতাদের যে দীর্ঘদিনের ‘ভোট ম্যানেজমেন্ট’ দক্ষতা, তা টপকানো সম্ভব হয়নি। তাছাড়া, আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশের ভোটাররা (যাদের ভোট সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি) চরম অনিশ্চয়তায় পড়ে শেষে পর্যন্ত স্থিতিশীলতার আশায় বিএনপির পক্ষ নিয়েছে।
জামায়াতের পাশাটি তাদের নিজেদের টেবিলে না গিয়ে থমকে গেছে ‘বিরোধী দল’ এর ঘরে। জামায়াত এখন বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল। গত তিন দশকে সংসদে বিরোধী দল হিসেবে কোনো ইসলামী দল এভাবে আসেনি। এটি তাদের জন্য এক বিশাল অর্জন হলেও ‘সরকার গঠন’ এর যে স্বপ্ন সমর্থকরা দেখেছিলেন, তা পূর্ণ হয়নি।
রাজনীতির পাশা খেলা বড়ই নিষ্ঠুর। যেখানে প্রচারণার পারদ আকাশচুম্বী থাকলেও চূড়ান্ত ডিক্রি আসে ব্যালট বাক্সে। জামায়াতের সুশৃঙ্খল শক্তি ও জনমত জরিপের জোয়ার থমকে গেছে বিএনপির দুই দশকের অপেক্ষার কাছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এখন চালকের আসনে। আর জামায়াত দাঁড়িয়েছে ওয়াচ-ডগ বা পাহারাদারের ভূমিকায়।
কার পাশা কার টেবিলে গেল, তার উত্তর এখন স্পষ্ট। ক্ষমতার টেবিলটি বিএনপির, আর রাজপথের লড়াকু বিরোধী দলের আসনটি জামায়াতের। এখন দেখার বিষয়, এই নতুন মেরুকরণ বাংলাদেশের আগামীর রাজনীতিকে কোন পথে নিয়ে যায়।