চট্টগ্রাম বন্দরে আটকা শতাধিক জাহাজ

চট্টগ্রাম বন্দরে আটকা শতাধিক জাহাজ

ইঞ্জিনের গর্জন নেই, নেই পণ্যবাহী ট্রাকের চিরচেনা জট। দেশের অর্থনীতির প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান তিনটি টার্মিনাল—জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)—গতকাল বুধবারও ছিল জনশূন্য। এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রমিক-কর্মচারীদের লাগাতার কর্মবিরতিতে বন্দরজুড়ে নেমে এসেছে ভূতুড়ে নীরবতা। জেটির বিশাল গ্যান্ট্রি ক্রেনগুলো আকাশের দিকে মুখ করে স্থির দাঁড়িয়ে থাকায় মনে হচ্ছে, পুরো দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম থমকে আছে।

গতকাল সকালে বন্দরে গিয়ে দেখা যায়, মানুষের আনাগোনা নেই; পণ্য ওঠানো-নামানোর আধুনিক যন্ত্রপাতি অলস পড়ে আছে। জেটিতে থাকা ১৪টি জাহাজ পণ্য খালাস করতে না পেরে আটকে রয়েছে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে এই তিনটি টার্মিনালই ২৪ ঘণ্টা সচল থাকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার থেকে নতুন জাহাজ জেটিতে ভেড়ানো যায়নি। এমনকি বহির্নোঙরে যাওয়ার প্রস্তুত জাহাজগুলোও বন্দর ত্যাগ করতে পারেনি। আন্দোলনকারীরা বন্দরের প্রতিটি প্রবেশপথে অবস্থান নেওয়ায় কোনো শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারেননি। ফলে জেটি থেকে ইয়ার্ড—সবখানেই জনমানবহীন চিত্র। স্বাভাবিক সময়ে বন্দরের ৪ নম্বর গেটের সামনে রপ্তানি ও আমদানি পণ্যবাহী লরি ও ট্রেইলারের দীর্ঘ সারি থাকলেও গতকাল দুই পাশই ছিল তালাবদ্ধ। ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য ছোট দরজা মাঝে মধ্যে খোলা হলেও পণ্যবাহী কোনো যানবাহনের দেখা মেলেনি।

গতকাল পর্যন্ত জেটি ও বহির্নোঙরে মোট ১৪২টি জাহাজ আটকা পড়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জাহাজে রয়েছে চিনি, ভোজ্যতেল ও ডালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। আমদানিকারকরা আশঙ্কা করছেন, টার্মিনাল অচল থাকলে বাজারের সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং রমজান মাসে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

বেসরকারি ডিপোগুলোতে গতকাল পর্যন্ত ১০ হাজার ৮১৭ টিইইউস (২০ ফুট দৈর্ঘ্যের কনটেইনারের একক) রপ্তানি কনটেইনার আটকা ছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশি জাহাজগুলো পণ্য না নিয়েই বন্দর ছাড়লে তৈরি পোশাক খাতে শত শত কোটি টাকার ক্রয়াদেশ বাতিলের ঝুঁকি তৈরি হবে। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার টিইইউস কনটেইনার খালাস হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে গেলেও কর্মবিরতি শুরুর পর থেকে এই চিত্র বদলে গেছে। গত শনিবার খালাস নেমে আসে এক হাজার ৭৫০ টিইইউসে; রবি ও সোমবার তা আরও কমে যথাক্রমে এক হাজার ৬৮৪ এবং এক হাজার ১,২৩০ টিইইউসে দাঁড়ায়। গতকাল বন্দরে কনটেইনারের সংখ্যা ছিল ৩৭ হাজার ৩১২ টিইইউস।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস প্রতিদিন গড়ে ১৭০ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। কর্মবিরতির কারণে দৈনিক রাজস্ব আদায় প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে।

বন্দরের ধারণক্ষমতা প্রায় ৫৯ হাজার কনটেইনার হলেও বর্তমানে জেটি, টার্মিনাল ও বহির্নোঙরে আটকা পড়েছে ৫২ হাজার ৪৯৬ টিইইউস কনটেইনার। প্রধান তিনটি টার্মিনালের জেটিতে ১৪টি জাহাজ (১০টি কনটেইনারবাহী ও চারটি খোলা পণ্যবাহী) গত মঙ্গলবার থেকে নড়তে পারেনি।

বেসরকারি ডিপো বা অফডকগুলো থেকে সাধারণত প্রতিদিন দুই হাজার ৮০০টি রপ্তানি কনটেইনার বন্দরে পাঠানো হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে এক হাজার ৪০০টিতে—অর্থাৎ ৫০ শতাংশ হ্রাস। ২১টি ডিপোতে আটকা রয়েছে ১০ হাজার ৮১৭ টিইইউস রপ্তানি ও সাত হাজার ৯১০ টিইইউস আমদানি পণ্য। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে খালি কনটেইনারে, যার সংখ্যা গতকাল পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ৪৯৬টিতে।

আন্দোলনের মুখে বন্দর কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে ৩১ শ্রমিক-কর্মচারীকে মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি করলেও এতে আন্দোলন আরও তীব্র হয়েছে। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, এনসিটি ইজারা বাতিল এবং বদলিকৃত কর্মচারীদের বদলির আদেশ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত টার্মিনালগুলো জনশূন্যই থাকবে।

শিপিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান জরুরি। আন্দোলন দীর্ঘ হলে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে এবং এর সরাসরি চাপ পড়বে সাধারণ ভোক্তার ওপর।

আই.এ/সকালবেলা

মন্তব্য করুন