রূপগঞ্জ থানায় এসআই নাজিম সিন্ডিকেটের ‘ওপেন হার্ট’ দুর্নীতি

এডমিন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬, ০৭:৫২ অপরাহ্ণ
রূপগঞ্জ থানায় এসআই নাজিম সিন্ডিকেটের ‘ওপেন হার্ট’ দুর্নীতি

রূপগঞ্জ থানায় কর্মরত অভিযুক্ত এসআই নাজিম ও তার সহযোগী চক্রের বিরুদ্ধে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ।

নোমান মুন্না জয় ,ক্রাইম রিপোর্টার : নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানায় মাদক নির্মূলের নামে ‘লুটতরাজ’, ঘুস গ্রহণ এবং মামলা বাণিজ্যের এক ভয়ংকর সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন খোদ পুলিশেরই কয়েকজন সদস্য। মাদক উদ্ধারের নাটক সাজিয়ে সাধারণ মানুষের ঘরে হানা দিয়ে নগদ টাকা লুটে নেওয়া, জব্দকৃত মালামাল আত্মসাৎ এবং শীর্ষ মাদক কারবারিদের সাথে মাসিক চুক্তিতে ‘মাসোহারা’ আদায়ের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই অন্ধকার কারবারের হোতা হিসেবে উঠে এসেছে সাব-ইন্সপেক্টর নাজিম, এসআই রেনুকা এবং এসআই জয়নালসহ একটি বিশেষ চক্রের নাম।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৭ এপ্রিল মাছিমপুর গ্রামের ফারুক মিয়ার বাসায় হানা দেয় এসআই নাজিম, রেনুকা ও জয়নালের নেতৃত্বে একদল পুলিশ। ফারুকের স্ত্রী রানু আক্তারের দাবি, পুলিশ ঘরে তল্লাশি চালিয়ে কোনো মাদক পায়নি। তবে তারা জোরপূর্বক তাকে গ্রেপ্তার করে এবং ঘর থেকে নগদ ১ লক্ষ ৯৫ হাজার ৫০০ টাকা হাতিয়ে নেয়। পরে রাতে থানায় হেরোইন জব্দ না দেখানোর শর্তে ভয় দেখিয়ে আরও ১ লক্ষ টাকা আদায় করা হয়। অথচ মামলার এজাহারে জব্দ দেখানো হয়েছে মাত্র ১ লক্ষ ৭ হাজার টাকা। বাকি টাকার কোনো হদিস নেই। রানু আক্তার আরও দাবী করেন, উদ্ধারকৃত ৩৫০পিস ইয়াবা ও হেরোইন আমার বাসা থেকে উদ্ধার হয়নি, এগুলো আমার স্বামীর অন্য একটি ভাড়াকৃত বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদের নামে থানায় নিয়ে তাকে জেলহাজতে প্রেরণ করে দেয়।"

শুধু টাকা লুট নয়, পুলিশের এই চক্রটি বড় বড় মাদক চালান গায়েব করে ছোট মামলার নাটক সাজাতেও পটু। অনুসন্ধানে মিলেছে, ইছাখালীর আউয়াল নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ হেরোইন ও ইয়াবা উদ্ধার করলেও ৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে মাত্র ৫ পিস ইয়াবা দিয়ে তাকে আদালতে পাঠানো হয়। এমনকি আসামি আওয়ালকে থানায় না এনেই বাইরে থেকে সরাসরি চালান দেওয়ার মতো বিধি-বহির্ভূত কাজ করার অভিযোগও উঠেছে। এছাড়া লিনা পেপার মিল চুরির প্রধান হোতা আইবুরের সাথে মুড়াপাড়া কলেজে এসআই নাজিমের সখ্যতার একটি ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। ভিডিওতে আইবুরের সাথে পুলিশের গোপন সখ্য স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। 

স্থানীয় সূত্র ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, রূপগঞ্জের প্রায় ৩০০টি মাদক স্পটের মধ্যে অন্তত ১৫-২০টি স্পট সরাসরি এসআই নাজিম-জয়নাল নিয়ন্ত্রণ করে। শুধু তাই নয়, স্পটভেদে মাসিক ৫ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত মাসোহারা আদায় করেন নাজিম-জয়নাল চক্র। এভাবে অনেক টাকা পয়সা কামিয়েছে” । 

অনুসন্ধানে গত এপ্রিল মাসে মুড়াপাড়া এলাকার ওয়াসিম নামে এক মাদক ব্যবসায়ীকে আটকের ঘটনায় এসআই নাজিমের সংশ্লিষ্টতা থাকলেও নথিপত্রে কৌশলে তার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা করা হয়েছে এসআই মনিরুল ইসলামকে। এক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, মাদক সিন্ডিকেটে জড়িত না থাকা এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে মাসোহারা চায় এসআই নাজিম। পরে মাসোহারা না পেয়ে ওই মামলায় তিন ব্যক্তিকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ‘পলাতক আসামি’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

অভিযোগের পাহাড় নিয়ে এসআই নাজিমের মুখোমুখি হলে তিনি নিজের অপরাধ আড়াল করতে অনুনয়-বিনয় শুরু করেন। তিনি বলেন, “নিউজ করে আমার ক্ষতি কইরেন না। আমি থানা ছেড়ে চলে যাব, আমি তো আপনাদেরই ভাই। আমার দিকে তাকিয়ে একটু দেখেন প্লিজ।” অন্যদিকে এসআই রেনুকা ফারুক মিয়ার স্ত্রী রানু আক্তারের গ্রেপ্তার ও টাকা লুটের ঘটনা অস্বীকার করলেও জব্দ তালিকায় নিজের স্বাক্ষর দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন এবং কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

নারায়ণগঞ্জ ‘গ’ সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. মেহেদী ইসলামের কাছে জানতে চাইলে বলেন, “এই অভিযোগগুলো এখন পর্যন্ত আমার কাছে আসেনি। তবে পুলিশের পোশাকে ঘুস বা মাদক কারসাজির কোনো সুযোগ নেই। যদি জড়িত থাকে তবে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

রূপগঞ্জের বাসিন্দাদের মতে, পুলিশ যখন নিজেই মাদক বাণিজ্যের অংশীদার হয়ে ওঠে, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা হুমকিতে পড়ে। অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির মাধ্যমে অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

মন্তব্য করুন