ডিজিটাল প্রেম ও কিশোর মন: আবেগ, আতঙ্ক আর সামাজিক নিয়ন্ত্রণের টানাপোড়েন

ডিজিটাল প্রেম ও কিশোর মন: আবেগ, আতঙ্ক আর সামাজিক নিয়ন্ত্রণের টানাপোড়েন

সুস্মিতা মুন্সি: স্কুলপড়ুয়া ১৫ বছর বয়সী মারজিয়া (ছদ্মনাম) কিংবা ১৬ বছরের রিফাত—তাদের গল্পগুলো এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ডিজিটাল প্রযুক্তির সহজলভ্যতা কিশোর-কিশোরীদের বন্ধুত্বের গণ্ডি পেরিয়ে অনলাইন প্রেমে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছে, যা একইসঙ্গে তৈরি করছে নতুন মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ।

বদলে যাওয়া বাস্তবতা ও পরিসংখ্যান বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) ২০২৫ সালের জুলাই মাসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা এখন ১৩ কোটি ৫৯ লাখ ৯০ হাজারে পৌঁছেছে। বিবিএস-এর সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, দেশের প্রায় ৫৬.২ শতাংশ পরিবার এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করে। হাতের নাগালে স্মার্টফোন ও সস্তা ডেটা প্যাক কিশোরদের অনলাইন উপস্থিতিকে যেমন বাড়িয়েছে, তেমনি তাদের আবেগীয় জগৎকেও করেছে ডিজিটাল-নির্ভর।

অনলাইন ঝুঁকি: যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিং ডিজিটাল দুনিয়ার এই আকর্ষণ সবসময় নিরাপদ নয়। ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে (বিএমজে) প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৮৮ শতাংশ মাধ্যমিক শিক্ষার্থী ইন্টারনেট ব্যবহার করে এবং তাদের অর্ধেকেরও বেশি অনলাইনে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। গবেষণার আরও কিছু উদ্বেগজনক তথ্য:

  • ৫৩ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন গ্রুমিং বা ফাঁদে ফেলার শিকার।

  • ৩৮ শতাংশ সাইবার ফ্ল্যাশিং বা অযাচিত নগ্ন ছবি পাওয়ার শিকার।

  • ৩৫ শতাংশ আপত্তিকর মেসেজ বা সেক্সটিং করার চাপে ছিল।

  • ১২ শতাংশ সেক্সটোরশন বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হয়েছে।

মানসিক বিপর্যয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ডিজিটাল সম্পর্কে বিচ্ছেদ বা ‘ব্লক’ করে দেওয়ার মতো বিষয়গুলো কিশোর মনে তীব্র বিষণ্ণতা তৈরি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জোবেদা খাতুন জানান, এই বয়সে আবেগ খুব গভীর হয় এবং সামাজিক প্রত্যাখ্যান তাদের একা করে ফেলে। অন্যদিকে, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা বেগমের মতে, আমাদের সমাজে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ওপর নজরদারি অনেক বেশি, যা মেয়েদের ওপর বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করে এবং গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহের ঝুঁকি বাড়ায়।

সমাধানের পথ বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পর্ক পুরোপুরি নিষিদ্ধ করলে কিশোর-কিশোরীরা আরও গোপনে কাজ করতে প্রলুব্ধ হয়, যা ব্ল্যাকমেইল ও সাইবার বুলিংয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। কড়াকড়ি নয়, বরং জীবন দক্ষতার শিক্ষা, সম্মতির ধারণা এবং সন্তান ও পিতামাতার মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করাই এই সংকটের প্রধান সমাধান হতে পারে।

এমএম/সকালবেলা

মন্তব্য করুন