আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্বজুড়ে আকাশপথের যাত্রী ও বিমান সংস্থাগুলোর ওপর নেমে এসেছে এক অভূতপূর্ব দুর্যোগ। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও বিমান চলাচলের জ্বালানি বা ‘জেট ফুয়েলে’র দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈশ্বিক এভিয়েশন শিল্প এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়ায় হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছে এয়ারলাইন্সগুলো। একই সঙ্গে আকাশচুম্বী বিমান ভাড়া এবং আনুষঙ্গিক ফি বৃদ্ধির ফলে সাধারণ যাত্রীদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে আকাশপথের ভ্রমণ। বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে এভিয়েশন খাতের জন্য একটি ‘পারফেক্ট স্টর্ম’ বা চরম সংকটকাল হিসেবে অভিহিত করছেন।
জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম ও সরবরাহ সংকট
দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে জেট ফুয়েলের দাম ৭৪২ ডলার থেকে বেড়ে ১,৭১০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। যুদ্ধের সরাসরি প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌ-চ্যানেল ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে তেলের জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় এই সংকট ঘনীভূত হয়েছে। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই সরু পথ দিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছায়। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স ম্যাকিরাস সতর্ক করেছেন যে, প্রধান ইউরোপীয় বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে জেট ফুয়েলের মারাত্মক সংকট তৈরি হতে যাচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, অনেক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে বিমান সংস্থাগুলোকে ‘জ্বালানি নেই’ (No Fuel Available) পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছে।
ফ্লাইট বাতিলের হিড়িক ও পরিসংখ্যান
এভিয়েশন অ্যানালিটিক্স কোম্পানি ‘সিরিয়াম’-এর তথ্যমতে, গত সোমবার নির্ধারিত ফ্লাইটের ৭ শতাংশ বা ৭,০৪৯টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা দেখা দিয়েছে উত্তর আমেরিকায়, সেখানে বাতিলের হার ১৪.৬ শতাংশে পৌঁছেছে। ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় তাদের মোট সক্ষমতার ৫ শতাংশ ফ্লাইট কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়া এয়ার নিউজিল্যান্ড মে মাসের শুরু পর্যন্ত ১,১০০টি এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ান গ্রুপ (SAS) এপ্রিলে অন্তত ১,০০০টি ফ্লাইট বাতিলের পরিকল্পনা করেছে। জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক দীর্ঘ পাল্লার ফ্লাইটকে এখন গন্তব্যে পৌঁছানোর পথে অন্য কোনো দেশে ‘ফুয়েল স্টপ’ নিতে হচ্ছে, যা সময় ও ব্যয় উভয়ই বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিমান ভাড়া ও আনুষঙ্গিক খরচ বৃদ্ধি
জ্বালানির বাড়তি খরচ সমন্বয় করতে গিয়ে এয়ারলাইন্সগুলো যাত্রীদের পকেট কাটতে শুরু করেছে। ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স-এর প্রধান নির্বাহী স্কট কার্বি জানিয়েছেন, লোকসান এড়াতে বিমান ভাড়া অন্তত ২০ শতাংশ বাড়াতে হবে। অনেক রুটে গড় বিমান ভাড়া ইতোমধ্যে ৪৬৫ ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০১৯ সালের পর সর্বোচ্চ। জ্বালানি কর বা ‘ফুয়েল সারচার্জ’-এর পাশাপাশি ব্যাগেজ ফি-ও বাড়ানো হচ্ছে। জেটব্লু (JetBlue) তাদের মালামাল বহনের খরচ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৭৫ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে।
অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব
বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক এয়ারলাইন্স এখন অস্তিত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জের মুখে। দক্ষিণ কোরিয়ার ‘কোরিয়ান এয়ার’ ১ এপ্রিল থেকে ‘জরুরি ব্যবস্থাপনা’ বা ‘এমারজেন্সি ম্যানেজমেন্ট’ কার্যক্রম শুরু করেছে। এদিকে ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক পরিণাম বিশ্বজুড়ে দৃশ্যমান হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো প্রতি গ্যালন ৪ ডলারে পৌঁছেছে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, এয়ার ফ্রান্স-কেএলএম এবং লুফথানসা ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে তাদের সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে। সামগ্রিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত না থামা পর্যন্ত বিমান চলাচল স্বাভাবিক হওয়া এবং ভাড়ার এই অস্থিরতা কমার কোনো লক্ষণ দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ, ইউরোনিউজ, এনবিসি নিউজ, সিরিয়াম, রয়টার্স এবং ব্লুমবার্গ।
আই.এ/সকালবেলা