নবাবী আমলে বাংলার ভূমি ও কৃষি ব্যবস্থা: ইতিহাসের কার্যকর মডেল

নবাবী আমলে বাংলার ভূমি ও কৃষি ব্যবস্থা: ইতিহাসের কার্যকর মডেল

আল মামুন >>>

বাংলার ইতিহাসে নবাবী আমল একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ সময়কার ভূমি বন্দোবস্ত ও কৃষি ব্যবস্থা শুধু তৎকালীন অর্থনীতিকেই শক্তিশালী করেনি, বরং পরবর্তীকালের ভূমি প্রশাসনের ভিত্তিও তৈরি করেছে। ইতিহাসবিদদের মতে, এই সময়ের ভূমি ব্যবস্থাপনা ও কৃষি কাঠামো আজও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

নবাবী শাসনের সূচনা হয় ১৮শ শতকের শুরুতে। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব বাংলার দেওয়ান হিসেবে মুর্শিদকুলি খান-কে নিয়োগ দেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলার সুবাদার হয়ে ১৭২৭ সালে নিজেকে নবাব ঘোষণা করেন এবং স্বাধীন নবাবী শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।

তার শাসনামলেই বাংলার ভূমি বন্দোবস্ত ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আনা হয়। তিনি ত্রুটিপূর্ণ রাজস্ব ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনেন এবং ‘মালজামিনী’ প্রথা চালু করেন। প্রশাসনিক সুবিধার জন্য বাংলাকে বিভিন্ন চাকলায় বিভক্ত করা হয় এবং প্রায় ১৬৬০টি পরগনায় ভাগ করা হয়।

নবাবী আমলে ভূমির সঠিক হিসাব রাখার জন্য জরিপ ব্যবস্থা চালু ছিল। ইজারাদারদের মাধ্যমে ভূমি বন্দোবস্ত দেওয়া হতো এবং নির্দিষ্ট চুক্তির ভিত্তিতে রাজস্ব আদায় করা হতো। ভূমি প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত ছিল—জায়গীর ও খালিশা।

এ সময় কৃষি ব্যবস্থাও ভূমি বন্দোবস্তের সঙ্গে সমন্বিতভাবে পরিচালিত হতো। কৃষকদের উৎপাদন বৃদ্ধি ও সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বাড়ানো হয়। ঐতিহাসিক তথ্যে জানা যায়, এ সময় বার্ষিক প্রায় এক কোটি তিন লক্ষ টাকা রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হয়েছিল, যা মোগল দরবারে প্রেরণ করা হতো।

পরবর্তীতে আলীবর্দী খানসিরাজউদ্দৌলা-এর শাসনামলেও এই ভূমি ও কৃষি ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। তবে ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ-এর মাধ্যমে নবাবী শাসনের অবসান ঘটে এবং ব্রিটিশ শাসনের সূচনা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নবাব মুর্শিদকুলি খানের প্রবর্তিত রাজস্ব ও ভূমি ব্যবস্থাই পরবর্তীতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভূমি নীতির ভিত্তি তৈরি করে।

সবশেষে বলা যায়, নবাবী আমলের ভূমি বন্দোবস্ত ও কৃষি ব্যবস্থা ছিল সুসংগঠিত, কার্যকর এবং সময়োপযোগী। এই ব্যবস্থার নানা দিক আজও গবেষণার বিষয় এবং আধুনিক ভূমি প্রশাসনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করে।

লেখক: শিক্ষক, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

এন.এ/সকালবেলা


মন্তব্য করুন