অনক আলী হোসেন শাহিদী >>>
বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা খাত দীর্ঘদিন ধরে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং কৃষির আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। এই খাতের দুইটি প্রধান প্রতিষ্ঠান—বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট—দেশের কৃষি উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব সংকট, প্রশাসনিক অদক্ষতা, দুর্নীতি ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তাদের মৌলিক লক্ষ্য অর্জনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।
দীর্ঘদিন মহাপরিচালক পদে পূর্ণকালীন ও দক্ষ নেতৃত্বের অভাবে তৃতীয় গ্রেডের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে রুটিন দায়িত্ব পালনের প্রবণতা দেখা গেছে, যা একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জন্য কাঙ্ক্ষিত নয়। এর ফলে গবেষণার গতি কমে যাওয়া, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা এবং কর্মপরিবেশে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দেশের শীর্ষস্থানীয় পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে অভিজ্ঞ, প্রশাসনিকভাবে দক্ষ এবং গবেষণা-সমঝদার একজন কৃষিবিদকে মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
এই আলোচনায় উঠে আসে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল-এর সদস্য পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) ডঃ মোঃ ছায়ফুল্লাহর নাম। তিনি দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক কাঠামো, পদোন্নতি প্রক্রিয়া এবং নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমের সাথে সরাসরি যুক্ত। ফলে কৃষি গবেষণা ব্যবস্থাপনায় তার বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে, যা তাকে এই ধরনের নেতৃত্বের জন্য উপযুক্ত করে তোলে।
ডঃ মোঃ ছায়ফুল্লাহর ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার সংগ্রামী ছাত্রজীবন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-এর ১৯৮৫-৮৬ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র হিসেবে তিনি তৎকালীন ছাত্ররাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকার কারণে ১৯৮৮ সালের ৬ অক্টোবর তিনি ছাত্রলীগের সশস্ত্র হামলায় গুরুতরভাবে আহত হন। ঐ ঘটনায় তার বাম হাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তাকে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে দীর্ঘ তিন মাস চিকিৎসা নিতে হয়। তৎকালীন জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোতে এই ঘটনার সংবাদ প্রকাশিত হয়, যেখানে উল্লেখ ছিল যে একই হামলায় আরও ১১ জন ছাত্রদল কর্মী আহত হন।
এই অভিজ্ঞতা তার ব্যক্তিত্বে দৃঢ়তা, সহনশীলতা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব দেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলেছে। দীর্ঘ কর্মজীবনে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি যে ধৈর্য, বিচক্ষণতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জন করেছেন, তা বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে অত্যন্ত মূল্যবান হতে পারে।
যদি তাকে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট অথবা বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তবে তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হতে পারেন। যেমন—প্রশাসনিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ, গবেষণার পরিবেশ উন্নয়ন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সমন্বয় ও আস্থা পুনর্গঠন। পাশাপাশি, তার অভিজ্ঞতা গবেষণা কার্যক্রমকে গতিশীল ও ফলপ্রসূ করতে সহায়ক হবে।
সর্বোপরি, বর্তমান প্রেক্ষাপটে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে এমন একজন ব্যক্তির প্রয়োজন, যিনি একই সাথে অভিজ্ঞ কৃষিবিদ, দক্ষ প্রশাসক এবং সংকট মোকাবিলায় দৃঢ়চেতা। ডঃ মোঃ ছায়ফুল্লাহর সেই যোগ্যতার একটি বাস্তব প্রতিফলন। তার মতো একজনকে দায়িত্ব প্রদান করলে দেশের কৃষি গবেষণা খাত নতুন গতি পেতে পারে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ ও লক্ষ্য পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে।