সন্তানের সুন্দর ও আদর্শ ভবিষ্যতের জন্য মা-বাবার ধর্মীয় করণীয়

প্রকাশ: সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ০১:৫০ অপরাহ্ণ
সন্তানের সুন্দর ও আদর্শ ভবিষ্যতের জন্য মা-বাবার ধর্মীয় করণীয়

ধর্মীয় প্রতিবেদক : মানবজীবনে পিতা-মাতার জন্য মহান আল্লাহ তায়ালার দেওয়া সব থেকে বড় এবং অন্যতম পবিত্র নেয়ামত হলো সন্তান। একটি শিশুর নিষ্পাপ উপস্থিতি শৈশবে মা-বাবার চোখের শীতলতা এনে দেয়, বার্ধক্যে হয়ে ওঠে তাদের একনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য জীবনসঙ্গী এবং মৃত্যুর পর অন্ধকার কবর জীবনে প্রতিনিয়ত সওয়াব ও নেক আমল পাঠানোর একমাত্র মাধ্যম (সদকায়ে জারিয়া)। ইসলামে এই অমূল্য নেয়ামত ও পারিবারিক আনন্দ উপভোগ করার পাশাপাশি সন্তানের প্রতি মা-বাবার কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি, সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা জোরালোভাবে বলা হয়েছে। আজকের শিশুই আগামী দিনে সমাজ ও রাষ্ট্রের হাল ধরবে। তাই সন্তানের কাছ থেকে ভবিষ্যতে দায়িত্বশীল আচরণ আশা করার আগে, তাদের প্রাপ্য শৈশব ও কৈশোরের অধিকারগুলো বুঝিয়ে দেওয়া মা-বাবার প্রধান এবং প্রথম কর্তব্য।

আজ সোমবার (৮ জুন) দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘ইসলাম ও সমকালীন সমাজ, জবান হেফাজত ও নৈতিকতা রক্ষা’ এবং ‘পারিবারিক অধিকার, শিশু মনস্তত্ত্ব, আদর্শ লালন-পালন ও শরিয়াহ ফতোয়া উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য মা-বাবার করণীয়সমূহ বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

পবিত্র ইসলামে সন্তানকে কোনো ধরনের জোরজবরদস্তি বা মানসিক চাপ সৃষ্টি করা ছাড়া অত্যন্ত আনন্দের সাথে ইসলামের আলোয় বড় করে তোলা এবং আল্লাহর ইবাদত শেখানো মা-বাবার প্রধান দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। পারিবারিক শিক্ষার গুরুত্ব দিতে গিয়ে পবিত্র কোরআনের সূরা আত-তাহরিমের ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।’ অর্থাৎ সন্তানকে কেবল জাগতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করলেই হবে না, তাকে পরকালের কঠিন শাস্তি থেকেও বাঁচানোর উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।

ইসলাম প্রতিটি মানবজীবনের অধিকার নিশ্চিত করেছে অত্যন্ত সুনিপুণ ও দূরদর্শীভাবে। একজন পুরুষের জন্য বিয়ের সময়ই এমন পুণ্যবতী জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়া উচিত, যিনি ভবিষ্যতে একজন আদর্শ মা হওয়ার সমস্ত গুণাবলী নিজের ভেতর ধারণ করেন। কারণ মায়ের কোলই শিশুর প্রথম পাঠশালা। রাসুলুল্লাহ (সা.) কুরাইশ বংশের নারীদের বিশেষ প্রশংসা করে বলেছিলেন যে, তারা সন্তানদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল এবং স্বামীদের সম্পদের প্রতি যত্নবান হন। এমনকি গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মায়ের স্বাস্থ্যের দিকেও বিশেষ নজর দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। রোজা রাখলে যদি মা বা গর্ভস্থ সন্তানের কোনো প্রকার শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তবে ইসলামে সেই মাকে রমজানের রোজা সাময়িকভাবে ভেঙে পরবর্তীতে সুবিধাজনক সময়ে কাজা করার বিশেষ আইনি অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই শিশুর মৌলিক অধিকারগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যায়। এর মধ্যে রয়েছে পুষ্টিকর খাদ্য, উপযুক্ত বস্ত্র, মানসম্মত চিকিৎসাসেবা এবং সপ্তম দিনে আকিকা করা। পবিত্র কোরআনে মায়ের বুকের দুধ পানের সময়সীমা পূর্ণ দুই বছর নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এই সময়ে সন্তানের মায়ের সম্পূর্ণ ভরণপোষণের আর্থিক দায়িত্ব বাবার ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। এছাড়া সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তার একটি সুন্দর, অর্থবহ ও ইসলামি নাম রাখার নির্দেশ দিয়েছেন বিশ্বনবী (সা.)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা ও স্নেহ প্রকাশের ব্যাপারে সবসময় উম্মতকে তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যে আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান দেখায় না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ একবার এক বেদুইন ব্যক্তি মহানবী (সা.)-কে তার প্রিয় নাতিকে চুমু খেতে দেখে অবাক হয়ে বলেন, ‘আমার দশটি সন্তান থাকা সত্ত্বেও আমি কখনো কাউকে চুমু খাইনি।’ জবাবে নবীজী (সা.) আক্ষেপ করে বলেন, ‘যে দয়া করে না, সে আল্লাহর দয়া পায় না। আল্লাহ যদি তোমার হৃদয় থেকে দয়া ও মায়া কেড়ে নেন, তবে আমার আর কী করার আছে।’

ইসলামী শরিয়ত প্রতিটি শিশুর একটি সুন্দর, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার নিশ্চিত করেছে। পরিবারের ও সন্তানের পেছনে অর্থ খরচ করাকে অন্যতম সেরা দান বা সদকা হিসেবে উল্লেখ করেছেন মহানবী (সা.)। এমনকি বিবাহবিচ্ছেদের (Divorce) মতো চরম অপ্রীতিকর ও বৈরী পরিস্থিতিতেও সন্তানের খাবার, পোশাক, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার যাবতীয় খরচ বহন করা বাবার জন্য আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। সামর্থ্য অনুযায়ী এই ব্যয়ভার বহন করার নির্দেশ দিয়ে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘বিত্তবান তার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে এবং যার জীবনোপকরণ সীমিত, সে আল্লাহ যা দিয়েছেন তা থেকে ব্যয় করবে।’ এছাড়া জন্মের দিন থেকেই মৃত পিতা-মাতার উত্তরাধিকারের আইনি ও পারিবারিক অধিকার নিশ্চিত করেছে ইসলাম।

ইসলামে সব সন্তানের প্রতি সমান আচরণ করার ওপর সবচেয়ে কঠোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। উপহার দেওয়া, অর্থ খরচ করা, নতুন পোশাক কিনে দেওয়া কিংবা স্নেহ-ভালোবাসা ও আদর প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো এক সন্তানকে অন্য সন্তানের ওপর বিন্দুমাত্র প্রাধান্য বা বৈষম্য করা যাবে না। তৎকালীন অন্ধকার যুগের গোত্রতান্ত্রিক ও বৈষম্যমূলক কন্যাশিশু হত্যার সমাজে ইসলাম যেভাবে সামাজিক ও মানবিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছিল, ঠিক একইভাবে বর্তমান পারিবারিক জীবনেও ছেলে ও মেয়ে উভয় সন্তানের মাঝে নিখুঁত সমতা বজায় রাখার নির্দেশ দেয়। সন্তান মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে মা-বাবার কাছে দেওয়া একটি পবিত্র সাময়িক আমানত, আর এই আমানতের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই মা-বাবা ইহকাল ও পরকালে চিরস্থায়ীভাবে পুরস্কৃত হবেন।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন