প্রাকৃতির সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে আছেন সুন্দরবনের বনজীবীরা

প্রকাশ: বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১৩ অপরাহ্ণ
প্রাকৃতির সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে আছেন সুন্দরবনের বনজীবীরা

মেহেদী হাসান মারুফ, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি: বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে উপকূলীয় অঞ্চলে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ জলরাশি যেমন উপকূলীয় মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস, তেমনি তা প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিও। নদী-খালঘেরা এই অঞ্চলে জীবন মানেই অনিশ্চয়তার সঙ্গে সহাবস্থান। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বাঘ-কুমিরের হামলা কিংবা বনদস্যুদের আতঙ্ক—সব মিলিয়ে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বেঁচে আছেন উপকূলের হাজারও মানুষ। এই সংগ্রামের এক জীবন্ত উদাহরণ বনবিবি মণ্ডল (৬৫)।

প্রখর রোদ, মুষলধারে বৃষ্টি কিংবা শীতের কনকনে হাওয়া—কোনোটিই থামাতে পারে না বনজীবীদের এই সংগ্রামকে। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের চুনকুড়ি গ্রামের বাসিন্দা বনবিবি মণ্ডল ও তাঁর স্বামী নির্মল মণ্ডল (৭০)। সুন্দরবনঘেঁষা চুনকুড়ি নদীর তীরের এই দম্পতি দীর্ঘ চার দশক ধরে বনের নদী ও খালে মাছ এবং কাঁকড়া আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

চুনকুড়ি নদীর ঘাড়বেঁকী খালে একটি ছোট নৌকায় বসে বৈঠা হাতে কথা বলেন বনবিবি মণ্ডল। জীবনের ভয়, কষ্ট আর টিকে থাকার দীর্ঘ ৪০ বছরের গল্প শোনাতে গিয়ে তিনি বলেন, "প্রথমে নদীতে নেমে জাল টানতাম, তখন পেটের সন্তান মারা যায়। পরে ধারদেনা করে একটি ছোট নৌকা কিনি। কয়েক বছর আগে স্বামী স্ট্রোক করার পর থেকে আর ভারী কাজ করতে পারেন না। আমার শরীরেও নানা রোগ বাসা বেঁধেছে। তাও নৌকার বৈঠা ছাড়িনি। জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই তিন মাস সুন্দরবন বন্ধ থাকলে খুব কষ্টে দিন কাটে।"

সুন্দরবনের ভেতরে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পথ চলতে হয়। কিন্তু এই দম্পতির ওপর আঘাত শুধু প্রকৃতি থেকেই আসেনি। তাদের একমাত্র সন্তান সঞ্জয় মণ্ডলকে সাত-আট বছর আগে বনে কাজ করতে গেলে অপহরণ করে বনদস্যুরা। ধারদেনা করে মুক্তিপণ জোগাড় করতে দেরি হওয়ায় সঞ্জয়ের ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। মারাত্মক শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সঞ্জয় আর ভারী কোনো কাজ করতে পারেন না। একমাত্র ছেলেকে হারানোর ভয়ে আর বনে যেতে দেন না বাবা-মা। ফলে প্রবীণ বয়সে এসেও নিজেদের পেট চালাতে প্রতিদিন জীবন বাজি রেখে বনে নামতে হয় এই দম্পতিকে।

বনবিবি-নির্মল দম্পতির এই গল্প সুন্দরবন উপকূলের একক কোনো ঘটনা নয়। জল-জঙ্গলের সীমান্তে এমন হাজারো পরিবার একই অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দিন পার করছে। নদীর পাড়ে জাল গুছাতে গুছাতে ষাটোর্ধ্ব জেলে গোপাল মণ্ডল বলেন, "জন্মে থেকেই এই বনে কাজ করছি। ঝুঁকি আছে জেনেও পেশা ছাড়তে পারি না, বনে না গেলে পেটে ভাত জোটে না।" তাঁর স্ত্রী সরস্বতী মণ্ডল জানান, স্বামী বনে গেলে সারাদিন চরম আশঙ্কায় কাটাতে হয় তাদের।

২৮ বছর বয়সী তরুণ বনজীবী রফিকুল ইসলাম বলেন, "বিকল্প কাজ নেই বলেই বনের মাছ আর কাঁকড়া আমাদের ভরসা। সরকার যদি অন্য কাজের সুযোগ দিত, তবে কেউ এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিত না।" একই কথা জানান স্থানীয় নারী বনজীবী কমলা রানীও।

স্থানীয় বনজীবীদের দাবি, গত ৫ আগস্ট দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে কয়েকটি দস্যু দল। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীভাঙন, প্লাবন ও মাছ-কাঁকড়ার উৎপাদন কমে যাওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। ঋণের ফাঁদে পড়ে নিস্ব হচ্ছেন অনেক বনজীবী।

সুন্দরবন ও বনজীবীবিষয়ক গবেষক এবং সাংবাদিক পীযূষ বাউলিয়া পিন্টু বলেন, "সুন্দরবননির্ভর বনজীবীদের জীবন শুধু দারিদ্র্যের নয়, এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা ও নিরাপত্তাহীনতার প্রতিচ্ছবি। বিকল্প জীবিকার অভাবেই তারা বারবার জীবন বাজি রেখে বনে ফিরে যান। শুধু নিষেধাজ্ঞা জারি না করে টেকসই কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বনজীবী ও সুন্দরবন উভয়কেই রক্ষা করার একমাত্র উপায়। মূলত এরাই সুন্দরবনের নীরব প্রহরী।"

এআইএল/সকালবেলা


মন্তব্য করুন