ফাঁসির আদেশ দিয়ে কেন কলমের নিব ভেঙে ফেলেন বিচারক
নিজস্ব প্রতিবেদক : সুদীর্ঘকাল ধরে দক্ষিণ এশিয়ার বিচারিক ইতিহাসে একটি দৃশ্য অত্যন্ত পরিচিত ও রহস্যময় হয়ে রয়েছে। আদালতকক্ষে যখন কোনো আসামির অপরাধের চূড়ান্ত বিচার হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বা ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়, তখন রায় সই করার পরপরই মাননীয় বিচারক বা বিচারপতিগণ তাঁর হাতের ব্যবহৃত কলমটির নিব সটান ভেঙে ফেলেন। এই প্রথাটি দেখতে যতটা নাটকীয়, এর ভেতরের অন্তর্নিহিত অর্থ এবং মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা ঠিক ততটাই সংবেদনশীল ও তাত্ত্বিক। অনেকেই মনে করেন এটি হয়তো আদালতের কোনো কঠোর আইনি বাধ্যবাধকতা বা সাংবিধানিক ধারা, যা না করলে রায় কার্যকর হবে না। তবে দেশের শীর্ষস্থানীয় আইন বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, দেশের প্রচলিত দণ্ডবিধি (Penal Code) কিংবা আদালতের কোনো অফিশিয়াল নিয়ম বা সংবিধানে কলমের নিব ভেঙে ফেলার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা বা ধারা উল্লেখ নেই। এটি মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে চলে আসা একটি চিরন্তন প্রতীকী ঐতিহ্য (Symbolic Tradition)।
আজ রবিবার (৭ জুন) বিকেল ৩টা ৪৪ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘আইন, আদালত ও মানবাধিকার’ এবং ‘বিচারিক মনস্তত্ত্ব, ঔপনিবেশিক প্রথা সংস্কার, আইনি ব্যাখ্যা ও দক্ষিণ এশিয়ার আদালত পর্যবেক্ষণ উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে বিচারকদের কলমের নিব ভাঙার পেছনের মূল ৩টি মনস্তাত্ত্বিক ও প্রতীকী কারণ বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রথার মাধ্যমে প্রথমত শাস্তির চূড়ান্ততা, গুরুতরতা এবং এর অপরিসীম আইনি নৈতিক ভার প্রকাশ করা হয়। একটি আদালতে যখন একজন বিচারক দণ্ডবিধির সর্বোচ্চ ধারা প্রয়োগ করে কোনো অপরাধীর মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা ও নথিপত্রে স্বাক্ষর করে ফেলেন, তখন আইনগতভাবে স্বয়ং ওই বিচারকেরও নিজের দেওয়া সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন, সংশোধন বা বাতিল করার আর কোনো আইনি সুযোগ বা ক্ষমতা থাকে না। রায় ঘোষণার সাথে সাথেই তাঁর সেই ক্ষমতা সমাপ্ত হয়। কলমের নিবটি প্রতীকীভাবে ভেঙে ফেলার মাধ্যমে মূলত এটিই বোঝানো হয় যে, এই রায়টি সম্পূর্ণ চূড়ান্ত, অপরিবর্তনীয় এবং এই একই কলম দিয়ে ওই রায়ের লাইনে আর কোনো নতুন শব্দ বা সংশোধন যোগ করা সম্ভব নয়।
একজন বিচারক যখন এজলাসে বসেন, তখন তিনি কোনো ব্যক্তিগত আবেগ, রাগ বা অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে রায় দেন না; বরং তিনি কেবলই আইনের ধারা ও প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেন। তবুও দিনশেষে একজন মানুষ হিসেবে অন্য কোনো মানুষের মৃত্যুর পরোয়ানা বা সর্বোচ্চ শাস্তির আদেশে স্বাক্ষর করা অত্যন্ত কঠিন এক মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। রায়ের পর কলমের নিব ভেঙে ফেলাকে অনেক ক্ষেত্রে বিচারকের ব্যক্তিগত বা প্রতীকী অনুশোচনার প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়। এর পেছনে অন্তর্নিহিত দর্শনটি হলো—যে কলমটি একটি জীবন্ত মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার বা ফাঁসির মঞ্চে পাঠানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হলো, সেই অপবিত্র বা ভারী হয়ে ওঠা কলমটিকে পুনরায় যেন অন্য কোনো সাধারণ বা ভালো রায়ের কাজে ব্যবহার করতে না হয়।
মৃত্যুদণ্ডের মতো একটি চরম ও মারাত্মক রায় ঘোষণার সময় আদালতকক্ষের পরিবেশ অত্যন্ত ভারী ও থমথমে হয়ে ওঠে, যা স্বয়ং বিচারকের অবচেতন মনেও এক ধরণের তীব্র মানসিক ও স্নায়বিক চাপ (Psychological Stress) তৈরি করতে পারে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, রায় দেওয়ার সুদীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে কলমের নিবটি শক্ত করে ভেঙে ফেলার এই প্রাচীন প্রথাকে কেউ কেউ সেই পুঞ্জীভূত মানসিক চাপ ও নৈতিক বোঝা থেকে প্রতীকীভাবে তাৎক্ষণিক মুক্তি পাওয়ার একটি মানবিক উপায় হিসেবেও ব্যাখ্যা করে থাকেন।
এই অনন্য এবং শতাব্দী প্রাচীন প্রথাটি বর্তমান বিশ্বে সব জায়গায় দেখা না গেলেও, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে—বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের আদালতগুলোতে এখনো এক অলিখিত ঐতিহ্যগত ও প্রতীকী রীতি হিসেবে অত্যন্ত সম্মান ও গাম্ভীর্যের সাথে টিকে রয়েছে।
জান্নাত সকালবেলা
|