শিশু রামিসা হত্যা মামলার রায় আজ রবিবার

প্রকাশ: রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ
শিশু রামিসা হত্যা মামলার রায় আজ রবিবার
নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির অবুঝ শিশু রামিসা আক্তারকে (৮) অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ঘরের ভেতর ডেকে নিয়ে পাশবিক ধর্ষণ এবং পরবর্তীতে নৃশংসভাবে গলা কেটে ধড় থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আজ চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হচ্ছে। পুরো দেশ ও বিচার বিভাগকে নাড়া দেওয়া এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করে আজ চূড়ান্ত রায় দেওয়ার মাধ্যমে দেশের বিচারিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন, দ্রুততম ও ঐতিহাসিক মাইলফলক স্থাপন করতে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনাল।

আজ রবিবার (৭ জুন) সকাল ৯টা ১৩ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘আইন-আদালত ও বিচার ব্যবস্থা’ এবং ‘নারী ও শিশু অধিকার রক্ষা, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণ ও ফৌজদারি মামলা মনিটরিং উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে আদালতের সর্বশেষ পরিস্থিতি ও মামলার আদ্যোপান্ত বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

আদালত সূত্র ও সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারী (পেশকার) পঙ্কজ পিটার গোমেজ আজ সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন যে, ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যunal-এর বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে আজ রবিবার এই হাইভোল্টেজ মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। এই রায়কে কেন্দ্র করে আজ সকাল ৮টা ৪৯ মিনিটে কড়া পুলিশি পাহারায় মামলার প্রধান অভিযুক্ত আসামি মো. সোহেল রানাকে এবং তার কিছুটা আগে তার স্ত্রী ও অপর সহযোগী আসামি স্বপ্না আক্তারকে কারাগার থেকে সরাসরি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের কেন্দ্রীয় হাজতখানায় এনে রাখা হয়েছে। আজ সকাল ১১টায় ট্রাইব্যুনালের এজলাসে দুই আসামির সশরীরে উপস্থিতি এবং উভয়পক্ষের আইনজীবীদের উপস্থিতিতে এই চূড়ান্ত রায় পাঠ করা হবে।

আইনজীবী ও আদালত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি স্পর্শকাতর ও ক্লু-লেস মার্ডার কেসের ক্ষেত্রে মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে তদন্ত, চার্জশিট, সাক্ষ্যগ্রহণ, যুক্তিতর্ক এবং চূড়ান্ত রায়ের দিন ধার্য হওয়া বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এক অলৌকিক ও নজিরবিহীন ঘটনা। গত ১৯ মে দিবাগত রাত ১২টা ৫ মিনিটে (অর্থ্যাৎ ২০ মে) পল্লবী থানায় নিহতের বাবার মামলা দায়েরের পর মাত্র ৫ দিনের মাথায় (২৪ মে) মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান আদালতে সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন।

ওইদিনই ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল হকের আদালত অভিযোগপত্রটি আমলে নিয়ে মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত বলে ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। একই দিন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনও চার্জশিটটি গ্রহণ করেন। এরপর জুন মাসের শুরুতে পবিত্র ঈদুল আজহার সরকারি ও বিচারিক দীর্ঘ ছুটি শুরু হলেও, এই চাঞ্চল্যকর মামলাটির দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক নিষ্পত্তির স্বার্থে ট্রাইব্যুনালের বিচারক নিজের ব্যক্তিগত ছুটি বাতিল করে বিশেষ শুনানির ব্যবস্থা করেন।

১ জুন দুই আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে চার্জ বা অভিযোগ গঠন করা হয়। ২ জুন মামলার বাদীসহ মোট ১৬ জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী আদালতে উপস্থিত হয়ে বুকফাটা কান্না আর জবানবন্দির মাধ্যমে সাক্ষ্য দেন। আদালত এক দিনের মধ্যেই ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও আসামিপক্ষের জেরা সমাপ্ত করেন। ৩ জুন আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে প্রধান আসামি সোহেল রানা নিজের পৈশাচিক অপরাধের দায় স্বীকার করে আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন, যদিও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। ৪ জুন রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুল রহমান দুলু এবং রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের ডিফেন্স আইনজীবী মূসা কালিমুল্লাহর আইনগত ও দীর্ঘ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত আজকের দিনটি রায়ের জন্য চূড়ান্তভাবে ক্যালেন্ডারভুক্ত করেন।

মামলার এজাহার ও চার্জশিটের লোমহর্ষক বিবরণ অনুযায়ী, নিহত ভুক্তভোগী শিশু রামিসা আক্তার (৮) স্থানীয় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির নিয়মিত ছাত্রী ছিলেন। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সে বাসা থেকে বের হলে প্রতিবেশী ঘাতক আসামি স্বপ্না আক্তার কৌশলে মিষ্টি বা অন্য কিছুর প্রলোভন দেখিয়ে রামিসাকে তাদের ফ্ল্যাটের ঘরের ভেতরে নিয়ে যায়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসার মা-বাবা তাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু করলে একপর্যায়ে ওই আসামির ফ্ল্যাটের দরজার বাইরে রামিসার ছোট জুতো জোড়া দেখতে পান।

তখন তাদের মনে সন্দেহ হলে ডাকাডাকি করেও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং ভবনের অন্যান্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা মিলে জোড়পূর্বক দরজা ভেঙে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন রক্তাক্ত মরদেহ এবং পাশের একটি বড় প্লাস্টিকের বালতির ভেতরে তার বিচ্ছিন্ন মাথাটি ভাসমান অবস্থায় দেখতে পান। তখন খাটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্বপ্না আক্তারকে আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি স্বীকার করেন যে, তার স্বামী মো. সোহেল রানা নিজের পৈশাচিক ও হীন কামলালসা চরিতার্থ করার জন্য রামিসাকে বাথরুমের ভেতর আটকে রেখে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে এবং পরবর্তীতে ঘটনা ধামাচাপা দিতে বটি বা ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা করেছে।

এই জঘন্য ঘটনায় শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করার পর পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে প্রথমে স্বপ্না আক্তারকে এবং পরবর্তীতে তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে পালিয়ে থাকা প্রধান খুনি সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। আজ পুরো দেশবাসী তাকিয়ে আছে ট্রাইব্যুনালের দিকে, যেখানে এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আশা করছেন নিহতের পরিবার ও সাধারণ নাগরিকেরা।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন