হাদি হত্যা মামলার অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন ১৫ বার পেছাল
আদালত প্রতিবেদক : চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাজপথের লড়াকু সৈনিক এবং ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর বলিষ্ঠ মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি (Sharif Osman Hadi) হত্যাকাণ্ডের অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা আবারও পিছিয়েছে। এ নিয়ে টানা ১৫ বারের মতো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছে আদালতের নির্দেশে দায়িত্ব পাওয়া পুলিশের বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থা ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (CID)। প্রতিবেদন দাখিলের নির্দিষ্ট দিনে আজ সিআইডি তা আদালতে পেশ করতে না পারায় বিচারক আগামী ১৭ জুন প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরবর্তী দিন নির্ধারণ করেছেন।
আজ রবিবার (৭ জুন) বিকেল ৪টা ২১ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘আইন-আদালত ও বিচারিক রুলিং’ এবং ‘রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ট্র্যাকিং, চাঞ্চল্যকর ফৌজদারি মামলা, অপরাধ তদন্ত ও প্রসিকিউশন উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে হাদি হত্যা মামলার সিআইডি তদন্তের বর্তমান স্থিতি এবং ডিবির আগের চার্জশিটের আদ্যোপান্ত বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
আদালতের সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউশন শাখা সূত্রে জানা গেছে, আজ রবিবার (৭ জুন) হাদি হত্যা মামলার অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য ছিল। কিন্তু মামলার বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তা তথা সিআইডি পুলিশের ঢাকা মেট্রোর (পূর্ব) সহকারী পুলিশ সুপার (ASP) আবদুর কাদির ভূঁঞা আজ নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন প্রস্তুত ও জমা দিতে পারেননি। এই প্রেক্ষিতে ঢাকার এডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহ সিআইডির আবেদন আমলে নিয়ে আগামী ১৭ জুন (বুধবার) প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পরবর্তী নতুন দিন ধার্য করেন। আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগের সাব-ইন্সপেক্টর (SI) রুকনুজ্জামান আজ বিকেলে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
আদালতের নথি পর্যালোচনা করে জানা যায়, এর আগে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তের দায়িত্বে ছিল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (DB)। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ডিবির পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ গত ৬ জানুয়ারি সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ফয়সাল করিম মাসুদ ও সাবেক বিতর্কিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পিসহ মোট ১৭ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে একটি নিয়মিত অভিযোগপত্র (Charge Sheet) দাখিল করেছিলেন। কিন্তু ডিবির দেওয়া সেই তদন্ত প্রতিবেদন ও আসামির তালিকায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি ইনকিলাব মঞ্চ।
গত ১২ জানুয়ারি মামলাটি আদালতে শুনানির জন্য উঠলে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব ও মামলার মূল বাদী আবদুল্লাহ আল জাবের ডিবির অভিযোগপত্রটি পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার জন্য আদালতের কাছে দুদিনের সময় প্রার্থনা করেন। আদালত তা মঞ্জুর করে ১৫ জানুয়ারি অভিযোগপত্রটি গ্রহণের দিন ধার্য করেন। কিন্তু ১৫ জানুয়ারি শুনানির দিনে বাদী আবদুল্লাহ আল জাবের ডিবির দেওয়া তদন্তে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে আদালতে একটি ‘নারাজি পিটিশন’ (Protest Petition) দাখিল করেন। বাদীর সেই নারাজি আবেদনের প্রেক্ষিতেই মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মামলাটি ডিবি থেকে সরিয়ে অধিকতর ও সুক্ষ্ম তদন্তের জন্য সিআইডিকে (CID) নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে সিআইডি দায়িত্ব পাওয়ার পর গত কয়েক মাসে ১৫ বার সময় চেয়েও তদন্ত শেষ করতে পারেনি।
উল্লেখ্য, জুলাই অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের রাজপথের তীব্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশব্যাপী ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিলেন তরুণ তুর্কি শরীফ ওসমান হাদি। দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর নির্বাচনী গণসংযোগ ও জনসংযোগের উদ্দেশ্যে তিনি ঢাকার বিজয়নগর এলাকায় যান।
সেখানে চলন্ত রিকশায় থাকা অবস্থায় একটি চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা পেশাদার আততায়ী তাঁকে লক্ষ্য করে অতর্কিত গুলি ছোঁড়ে। বুক ও পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর জখম হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে জটিল অস্ত্রোপচার করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে রাতেই তাঁকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। এর দুদিন পর উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে হাদিকে সুদূর সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় গত ১৮ ডিসেম্বর ডাক্তাররা হাদিকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে পল্টন থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেছিলেন, যা পরবর্তীতে হাদির মৃত্যুর পর ৩০২ ধারায় নিয়মিত হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। ডিবির দেওয়া অভিযোগপত্রে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, আসামিদের আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের রাজনৈতিক পরিচয় এবং বিভিন্ন সময়ে হাদির দেওয়া ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে করা কড়া রাজনৈতিক বক্তব্য বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, চরম ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার’ কারণেই হাদিকে সুপরিকল্পিতভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে দেশী-বিদেশী মহলে ‘বাধাগ্রস্ত করতে’ এবং সাধারণ ভোটারদের মনে তীব্র ভয়ভীতি তৈরি করতেই মূল আসামী ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগীরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে হাদির নির্বাচনী প্রচারণায় অনুপ্রবেশ করে রিকশায় গুলি চালিয়েছিল।
এই মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ (৩৭), সাবেক কাউন্সিলর বাপ্পীসহ মোট ৫ জন আসামি এখনও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে পলাতক রয়েছে, যাদের অনেকে ভারতে পালিয়ে গেছে বলে ডিবির রিপোর্টে উল্লেখ ছিল। সিআইডির অধিকতর তদন্তে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো মাস্টারমাইন্ড বা রাজনৈতিক বড় নেতার হাত রয়েছে কিনা—তা উন্মোচনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন দেশের রাজনৈতিক মহল ও হাদির সহযোদ্ধারা।
জান্নাত সকালবেলা
|