মাতৃত্ব শৃঙ্খল নয় হোক আনন্দের

প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ০৫:১৩ অপরাহ্ণ
মাতৃত্ব শৃঙ্খল নয় হোক আনন্দের

ফিচার ডেস্ক:একটি বিড়াল মা হয়েছে। ছানাদের প্রতি প্রগাঢ় মমতা নিয়ে সে পালন করে যাচ্ছে মায়ের স্বাভাবিক দায়িত্ব। আবার কিছু সময়ের জন্য ছানাদের নিরাপদে রেখে সে নিজের মতো করে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ তার খাদ্যের ব্যবস্থা কিন্তু ঘরের ভেতরেই ছিল। তবুও একটি বিড়াল সন্তান পালনের মতো গুরুদায়িত্বের মধ্যেও ঠিকই নিজের জন্য ‘মি টাইম’ (নিজের একান্ত সময়) কাটিয়ে আসছে, নিজেকে গুছিয়ে রাখছে এবং প্রয়োজনমতো বিশ্রামও নিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু মানবসমাজে, বিশেষ করে আমাদের এই পুরুষতান্ত্রিক পরিমণ্ডলে মাতৃত্বের যে চিত্র, তা প্রাণিজগৎ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং অনেক বেশি দমবন্ধ করা।

গত রবিবার (৭ জুন) অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘লাইফস্টাইল, ঘরকন্না, মনস্তত্ত্ব ও সমাজভাবনা’ এবং ‘ফিটনেস, মানসিক স্বাস্থ্য ও সুষম জীবনধারা ব্যবস্থাপনা’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে মাতৃত্বের ওপর চাপানো কৃত্রিম শ্রেষ্ঠত্বের ভার এবং নারীদের স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার অধিকার নিয়ে তৈরি বিশেষ খতিয়ান বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

প্রাণিজগতের মায়েদের আচরণ ও জীবনধারা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা আমাদের শেখানো সামাজিক ‘মহত্ত্বের’ চেয়ে বরং ‘ব্যবহারিক’ ও বাস্তববাদী দিকেই বেশি নজর দেয়। মানুষ মায়েদের যেখানে ২৪ ঘণ্টা সন্তানের চিন্তায় বুঁদ হয়ে থাকাকেই ‘আদর্শ’ বা একমাত্র মাপকাঠি মনে করা হয়, প্রাণীরা সেখানে বেশ প্রাকৃতিকভাবে জীবন কাটায়। মানবসমাজ মায়েদের ওপর এমন এক অলৌকিক শ্রেষ্ঠত্ব আর মাহাত্ম্য চাপিয়ে দিয়েছে যে, সেই অদৃশ্য ভারের নিচেই আজ মায়েরা প্রতিনিয়ত পিষ্ট হচ্ছেন।

বিখ্যাত লেখক ও ভাষাবিজ্ঞানী হুমায়ুন আজাদের মতে, “পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতার শ্রেষ্ঠ শহীদের নাম ‘মা’।” সমাজ যেন অবচেতনভাবেই ঠিক করে দিয়েছে—একজন মা যত বেশি নিজের ব্যক্তিগত সুখ, শখ-আহ্লাদ, ক্যারিয়ার ও স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে, সন্তান ও পরিবারের জন্য নিজ অস্তিত্বকে পুরোপুরি বিলীন করে দিতে পারবেন, তিনি সমাজে তত ‘ভালো মা’ হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন। নিজের শারীরিক ক্লান্তি কিংবা মানসিক অবসাদকে লুকিয়ে রাখাই যেন মায়েদের প্রধান যোগ্যতা। যখনই একজন মা নিজের জন্য কিছুটা ব্যক্তিগত সময় চান বা নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে নতুন করে ভাবতে যান, এই সমাজ তাকে ‘স্বার্থপর’ বা ‘খামখেয়ালি’ তকমা দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। ত্যাগের এই অতিপ্রাকৃতিক মহিমা মায়েদের মানুষ হিসেবে বাঁচতে না দিয়ে এক আবেগহীন রোবট বা দেবীতে পরিণত করে। অথচ প্রাণিজগতে মা হওয়া মানে স্রেফ একটি জৈবিক দায়িত্ব পালন করা, যেখানে সন্তানের যত্নের পাশাপাশি নিজের অস্তিত্বকে বিলীন করার কোনো ‘পারফেক্ট মা’ হওয়ার প্রতিযোগিতা থাকে না।

‘মায়েরা শ্রেষ্ঠ’—এমন ধারণার বশবর্তী হয়ে সমাজ অনেক সময় নারীর গর্ভধারণ করাকেই নারীত্বের একমাত্র পরম মর্যাদা হিসেবে দেখতে শুরু করে। ফলে নারীদের সাধারণত বিয়ের ফুলসজ্জা হতে না হতেই বারবার তীব্র সামাজিক ও পারিবারিক দাবির মুখে পড়তে হয় যে, ‘এবার একটা বাচ্চা নিয়ে নাও।’ অথচ হয়তো সেই নারীর শরীর বা মন মা হওয়ার জন্য তখনও অভ্যন্তরীণভাবে যথেষ্ট প্রস্তুতি নেয়নি। পরিবার ও সমাজের ইচ্ছার কাছে নতিস্বীকার করেই বেশির ভাগ সময় তাকে গর্ভধারণ করে নিজেকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসাতে হয়। এবং পরবর্তীতে গর্ভধারণ করে তাঁরাও ঠিক একইভাবে অন্য নারীদের গর্ভধারণ করার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করে দেন।

কোনো নারী যদি নিজের কিংবা সঙ্গীর শারীরিক জটিলতার কারণে কখনও সন্তান ধারণ করতে না পারেন, কিংবা কোনো নারী নিজ ইচ্ছাতেই আজীবন অবিবাহিত থাকার সিদ্ধান্ত নেন—তাঁদের সমাজ প্রতিনিয়ত খোটা দিয়ে বলে, ‘নিজে তো গর্ভধারণ করেনি, তাই মায়ের বেদনা বুঝবে না।’ অথচ যে নারী বছরের পর বছর সন্তান পাওয়ার জন্য বুকফাটা চেষ্টা করে যাচ্ছেন কিন্তু ব্যর্থ হচ্ছেন, তাঁর ভেতরের তীব্র মানসিক বেদনা কি এই সমাজ-স্বীকৃত শ্রেষ্ঠ মায়েরা কখনো অনুধাবন করতে পারেন?

আবার গর্ভধারণ করতে পারলেও এই সমাজে সব মাকে একই রকম মর্যাদার চোখে দেখা হয় না। তাই তো মাঝে মাঝেই সমাজ-স্বীকৃত সম্পর্কের বাইরে জন্ম নেওয়া নবজাতকদের পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় রাস্তার ডাস্টবিনে—কখনও জীবিত আবার কখনও মৃত। জন্মপ্রক্রিয়া যেমনই হোক, এর জন্য তো সেই নিষ্পাপ শিশুটি দায়ী নয়! তবুও সমাজে এমন মাতৃত্ব ও নারীত্বের ওপর যুগ যুগ ধরেই কলঙ্কের কালিমা লেপন করে দেওয়া আছে, যার ফলে মা ও শিশু দুজনকেই জগতের নিষ্ঠুরতম মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণার শিকার হতে হয়।

মানুষের উন্নত বুদ্ধি ও আবেগ অবশ্যই মাতৃত্বকে এক অনন্য গভীরতা ও নান্দনিকতা দেয়। কিন্তু আমরা যদি প্রাণীদের মতো বিষয়টাকে একটু প্রাকৃতিকভাবে ও সহজভাবে দেখতে শিখতাম, তবে মায়েদের ওপর থেকে এই ‘পবিত্রতার কৃত্রিম বোঝা’টা অনেকটাই কমত এবং সমাজও আরেকটু মানবিক হয়ে উঠত।

মায়েরা যদি সমাজ নির্ধারিত ‘সুপারমম’ হওয়ার এই ক্লান্তিকর ইঁদুর দৌড় থেকে নিজেদের বের করে এনে কিছুটা বাস্তববাদী হতে পারেন, তবেই এই দমবন্ধ করা শ্রেষ্ঠত্বের ভার কমবে। মাকে সম্মান দেওয়া অবশ্যই প্রতিটি সন্তানের ও সমাজের পরম দায়িত্ব, কিন্তু সেই সম্মান যেন তাঁকে একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবে স্বাভাবিকভাবে বাঁচার অধিকার থেকে বঞ্চিত না করে। মাতৃত্ব কোনো অলৌকিক ক্ষমতা বা শৃঙ্খল নয়, এটি জীবনের একটি সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মাত্র। আমাদের উচিত মায়েদের সেই মুক্ত ও ভারমুক্ত আকাশটুকু উপহার দেওয়া, যেখানে তিনি কেবল ‘মহৎ মা’ নামক বন্দিশালায় না থেকে, একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে নিজের মতো করে মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পারেন।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন