সুন্দরবনঘেঁষা কয়রায় জলবায়ু পরিবর্তনের চরম মূল্য দিচ্ছে ৯৭% পরিবার
মোস্তাফিজুর রহমান, কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি: জলবায়ু পরিবর্তনের এক চরম ও বৈরী থাবার মুখে পড়েছে খুলনার সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় উপজেলা কয়রার সাতটি ইউনিয়ন। একের পর এক প্রলয়ঙ্করী প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতে এই অঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে বুক দিয়ে লড়াই করে টিকে আছে স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে সবচেয়ে বেশি মানবিক ও মারাত্মক স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে রয়েছেন অবহেলিত নারী ও শিশুরা। সাম্প্রতিক বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, কয়রার ৭টি ইউনিয়নের প্রায় ৯৭ শতাংশ পরিবার জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সরাসরি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।
উপজেলার আমাদী, বাগালী, মহেশ্বরীপুর, মহারাজপুর, কয়রা সদর, উত্তর বেদকাশী ও দক্ষিণ বেদকাশী—এই সাতটি ইউনিয়নেই বিগত বছরগুলোতে সিডর, আইলা, আম্ফান, সিত্রাং ও রেঁমালের মতো প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ঘন ঘন আঘাত হেনেছে। এর সাথে প্রতিনিয়ত যুক্ত রয়েছে কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীর তীব্র ভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও অসময়ে অতিবৃষ্টির প্রকোপ। এই বহুমুখী দুর্যোগের ফলে এখানকার দরিদ্র পরিবারগুলো বারবার নিঃস্ব হচ্ছে। জীবনসংগ্রামের তাগিদে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদেরও দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হচ্ছে শুধু দুমুঠো অন্ন জোগাড়ের জন্য। কিন্তু এই লড়াইয়ের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে শিশুদের শিক্ষা আর নারীদের ন্যূনতম স্বাস্থ্যসুরক্ষা। অথচ, এই বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশই জানে না তাদের মৌলিক ও আইনি অধিকারের কথা।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই নির্মম বাস্তবতার ভুক্তভোগী কয়রার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের বাসিন্দা মারুফা খাতুন। কপোতাক্ষের পাড়ে দাঁড়িয়ে চোখ মুছতে মুছতে তিনি বলেন, “আইলা, আম্ফান আর সিত্রাং আমাদের সব কেড়ে নিইছে। এখন অসময়েও নদী রাক্ষসের মতো ফুঁসে ওঠে, চোখের সামনে বাঁধ ভাইঙে লোনা পানি ঘরে ঢোকে। রাইতে একটু মেঘ ডাকলে বা জোয়ারের শব্দ পাইলে আমরা আর ঘুমাইতে পারি না, এই বুঝি ঘরবাড়ি নদীতে চইলে গেল! আমাদের জমিতে এখন আর ধান হয় না। এক কলস মিষ্টি পানির জন্য আমাগো মাইলের পর মাইল হাইটে যাইতে হয়। এই লোনা পানির মধ্যে থাইকে আমাগো শরীরের চামড়ায় ঘা হয়ে গেছে, ঘরের মা-বোনদের নানা রোগব্যাধি লেগে থাকে। আমরা তো ত্রাণ চাই না, আমরা একটু শান্তিতে বাঁচার মতো টেকসই বেড়িবাঁধ আর একটু সুপেয় পানি চাই।”
বাংলাদেশ মানবাধিকার ব্যুরো কয়রা উপজেলা শাখার সভাপতি তরিকুল ইসলাম বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট দুর্যোগে কয়রার ৭টি ইউনিয়নেই নারী ও শিশুরা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছে। বারবার দুর্যোগের ফলে শিশুরা স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে এবং নারীরা প্রজনন স্বাস্থ্যসহ নানা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভুগছেন। মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এই মানুষগুলোকে অধিকার সচেতন করা এবং তাদের টেকসই পুনর্বাসনের জন্য এখনই রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”
খুলনা জেলা বিএনপির সদস্য এম এ হাসান বলেন, “কয়রার মানুষ প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে আছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বারবার ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনে সবকিছু হারিয়ে সাতটি ইউনিয়নের দরিদ্র জনগোষ্ঠী আজ চরম সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জীবন আজ সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত। এই অঞ্চলের মানুষের জন্য টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না করলে এই মানবিক বিপর্যয় আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।”
কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল করিম বলেন, “উপকূলীয় এলাকায় অতিরিক্ত গরম, তীব্র লবণাক্ততা ও অন্যান্য জলবায়ু সংক্রান্ত সমস্যার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা শিশুদের অনেক কম। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় তারা ডায়রিয়া, পুষ্টিহীনতা ও অন্যান্য প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি থাকে। তাছাড়া লোনা পানির ক্রমাগত ব্যবহারের কারণে প্রায়ই অ্যালার্জি, চর্মরোগ, ভাইরাস ও ছত্রাকজনিত নানা জটিল জরায়ু ও চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন এই সাত ইউনিয়নের নারী ও শিশুরা। জলবায়ুর এই পরিবর্তনের ফলে দিন দিন এখানে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও তীব্র হচ্ছে।”
সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে প্রকৃতির সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করা এই সাতটি ইউনিয়নের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, শিক্ষার আলো নিশ্চিতকরণ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীর ভাঙন রোধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এখন কয়রাবাসীর সবচেয়ে বড় ও প্রধান দাবি।
এআইএল/সকালবেলা
|