চরাঞ্চলে নড়বড়ে সাঁকোয় ২০ হাজার মানুষের দুর্ভোগ
হাবিবুল্লাহ্ সরকার, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা): গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের কিশামত সদর ও বেলকা নবাবগঞ্জ গ্রামের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে তিস্তা নদীর প্রায় ১২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি শাখা। এই ছোট্ট নদীটিই দীর্ঘ দিন ধরে দুই পাড়ের প্রায় ২০ হাজার মানুষের জীবনকে দুর্ভোগে ফেলে রেখেছে।
প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই নদী পার হতে হচ্ছে চরাঞ্চলের হাজার হাজার শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী, নারী ও বৃদ্ধদের।
একপাশে চরাঞ্চলের মানুষের বসতি আর অন্যপাশে হাট-বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্র ও জীবিকার পথ হওয়ায় এই নদী পারাপার সবার জন্য বাধ্যতামূলক। দীর্ঘ প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে নৌকায় পারাপার চললেও বর্ষায় উজান থেকে নেমে আসা ঢল আর তীব্র স্রোতে তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেত। চরম ভোগান্তিতে পড়ত স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা, সময়মতো হাসপাতালে নিতে না পারায় সংকটাপন্ন হয়ে উঠত জরুরি রোগীরা এবং হাটে নিতে না পেরে অল্প দামে নষ্ট হতো কৃষকের কষ্টের ফসল।
চরাঞ্চলের মানুষের এই দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবের কথা চিন্তা করে ২০১৭ সালে বেলকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইব্রাহীম খলিলুল্যাহ নিজ উদ্যোগে নদীর ওপর প্রায় ১২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি কাঠের সাঁকো নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দ ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের সহযোগিতায় এটি বেশ কয়েকবার সংস্কার করা হয়। ২০২০ সালের বন্যায় সাঁকোটি পুরোপুরি ভেঙে গেলে ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে তা আবার নতুন করে তৈরি করা হয়। কিন্তু প্রতিবছর মেরামত করেও কাঠ ও বাঁশের তৈরি এই অস্থায়ী কাঠামোকে স্থায়ীভাবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
চলতি বর্ষায় কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলে নদীতে পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি স্তূপ স্তূপ কচুরিপানা ভেসে এসে সাঁকোর নিচে আটকে গেছে। কচুরিপানার অতিরিক্ত ভার আর পানির তীব্র তোড়ে সাঁকোটির বিভিন্ন অংশ এখন বেঁকে ও দেবে গেছে। কোথাও কাঠ পচে গেছে, কোথাও বাঁশ আলগা হয়ে দুলছে।
বৃষ্টির দিনে সাঁকোটি চরম ভেজা ও পিচ্ছিল হয়ে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই পিছলে পড়ে সাইকেলসহ নদীতে পড়ে যাওয়ার মতো ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। এই পরিস্থিতিতে গ্রামবাসীরা নিজেরাই স্বেচ্ছাশ্রমে নদী থেকে হাত দিয়ে টেনে ও বাঁশ দিয়ে ঠেলে কচুরিপানা সরানোর আপ্রাণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয় স্কুলছাত্র মো. আরিফুল ইসলাম, কৃষক আমজাদ আলী, মুদি ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম, গৃহবধূ আকলিমা বেগম ও পল্লী চিকিৎসক শিহাব মো. শাহাবুদ্দিনসহ চরাঞ্চলের সর্বস্তরের মানুষ জানান, স্বাধীনতার এত বছর পরও একটি স্থায়ী পাকা সেতুর অভাবে ২০ হাজার মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। জরুরি রোগী বহনে কোনো অ্যাম্বুলেন্স এই চরে আসতে চায় না। এখানে একটি পাকা সেতু নির্মাণ হলে এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা, চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা ও কৃষি অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী বিপ্লব আসবে।
বেলকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইব্রাহিম খলিলুল্যাহ বলেন, "২০১৭ সালে নিজ উদ্যোগে কাঠের সাঁকোটি নির্মাণের পর থেকে প্রতিবছরই ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দ দিয়ে এটি কোনোমতে টিকিয়ে রাখছি। কিন্তু বন্যা আর কচুরিপানার চাপে বারবার এটি নাজুক হয়ে পড়ে। কাঠের সাঁকো দিয়ে আর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। জনসাধারণের দীর্ঘদিনের দাবি বিবেচনা করে এখানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে।"
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) তপন কুমার চক্রবর্তী জানান, ওই স্থানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সেতু নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটির সরকারি অনুমোদন পেলেই দ্রুত সেতুটি বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এআইএল/সকালবেলা
|