বিএডিসির VHT প্রযুক্তিতে নিরাপদ আম রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা
অনক আলী হোসেন শাহিদী: আমকে বলা হয় ফলের রাজা। এই ফলকে ঘিরে বাঙালির আবেগ, সংস্কৃতি ও স্মৃতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। পল্লীকবি জসিম উদ্দিন-এর বিখ্যাত কবিতা “মামার বাড়ি”-এর সেই চিরচেনা পঙ্ক্তি—“ঝড়ের দিনে মামার দেশে আম কুড়াতে সুখ”—আজও আমাদের শৈশব স্মৃতিকে নাড়া দেয়। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাস এলেই আমের সুবাসে ভরে ওঠে প্রকৃতি, আর মানুষের মনেও জাগে উৎসবের আমেজ।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৮০০ প্রজাতির আম উৎপাদিত হয়, যার মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয় ২৭০টিরও বেশি জাত। প্রতিবছর প্রায় ২৫-২৭ লক্ষ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়, যা দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও ক্রমশ জায়গা করে নিচ্ছে। যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স, সুইডেন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের আমের চাহিদা বাড়ছে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের একটি বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল ফলমাছি ও অন্যান্য ক্ষতিকর জীবাণুর উপস্থিতি। রপ্তানির জন্য ফলকে অবশ্যই পোকামাকড়মুক্ত, নিরাপদ এবং মানসম্মত হতে হয়। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে উঠে এসেছে ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট (VHT) বা বাষ্প তাপ প্রয়োগ পদ্ধতি।
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় বাষ্প প্রয়োগ করে ফল ও সবজির ভেতরে থাকা পোকামাকড়, ডিম, লার্ভা ও জীবাণু ধ্বংস করা হয়। ফলে ফলের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি এর গুণগত মান বজায় থাকে এবং সংরক্ষণকাল (shelf life) ৮-১০ দিন পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে আমের রং আরও উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় হয়।
এই আধুনিক প্রযুক্তি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)। “আম ও অন্যান্য সতেজ কৃষিপণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধিতে বাষ্প তাপ প্রয়োগ প্লান্ট স্থাপন” শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ঢাকার গাবতলীতে একটি আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এখানে একটি অটো কনভেয়ার প্যাকেজিং লাইনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পণ্য মোড়কীকরণও করা হচ্ছে।
উক্ত প্লান্টে একবারে প্রায় ৩ মেট্রিক টন আম বা সবজি ট্রিটমেন্ট করা সম্ভব। ট্রিটমেন্ট শেষে প্রায় ৩০ মিনিট ধরে পানি দিয়ে ধোয়া ও শুকানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়, যাতে ফলের ভেতরে থাকা সব ধরনের ক্ষতিকর উপাদান সম্পূর্ণভাবে নির্মূল হয়। ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩ মেট্রিক টন আম সফলভাবে ট্রিটমেন্ট করা হয়েছে।
শুধু আম নয়, কমলা, মাল্টা, লেবু, বরই, লিচু, আনারস, পেয়ারা, ড্রাগন ফলসহ বিভিন্ন ফল এবং আলু, পেঁপে, টমেটো, শসা ও কুমড়ার মতো সবজির ওপরও এই প্রযুক্তির প্রয়োগ চলছে। এতে কৃষক, ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকরা সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন এবং দেশের কৃষিপণ্য রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি দেশের কৃষিপণ্য রপ্তানিতে একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। তবে এর সুফল আরও বিস্তৃত করতে হলে প্রয়োজন এ কার্যক্রমের সম্প্রসারণ, আধুনিকায়ন এবং সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা। কৃষক ও উদ্যোক্তা পর্যায়ে এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে নিরাপদ ও মানসম্মত ফল ও সবজি রপ্তানিতে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, বাষ্প তাপ প্রয়োগ (VHT) প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষিপণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করে রপ্তানি বৃদ্ধিতে বিএডিসির এই উদ্যোগ দেশের কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে।
|