রিলস বানাতে গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে আসল আড্ডার সংস্কৃতি
তবে সময়ের চাকা ঘোরার সাথে সাথে আজ আমাদের সেই চিরচেনা চিরন্তন দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে। প্রযুক্তির অভাবনীয় ও দ্রুত অগ্রযাত্রা মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রাকে বহুল পরিমাণে সহজ ও গতিশীল করেছে ঠিকই, তবে এর নেপথ্যে থাকা কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ও মারাত্মক নেতিবাচক সামাজিক প্রভাবও দিন দিন সমাজের বুকে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আজ রবিবার (৩১ মে) দুপুর ১২টা ১৬ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত এক বিশেষ কলামে বর্তমান সমাজের এই মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক সংকটটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
বর্তমানে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক কিংবা অন্যান্য জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তীব্র ও সর্বগ্রাসী বিস্তার আধুনিক মানুষের অবসর সময়ের সিংহভাগ অংশই পুরোপুরি গ্রাস করে নিয়েছে। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে ‘রিলস’ বা স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও তৈরি করার এক অদ্ভুত ও অন্ধ প্রবণতা তরুণ প্রজন্মের মাঝে এমন এক কৃত্রিম সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে, যেখানে কোনো বিশেষ মুহূর্তকে সশরীরে মন থেকে উপভোগ করার চেয়ে সেটিকে যেকোনো উপায়ে ক্যামেরাবন্দি করে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় প্রকাশ করাই যেন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বা মর্যাদার বিষয় হয়ে উঠছে।
আজকাল প্রায় প্রতিটি পরিবারেই উৎসবের দিনগুলোতে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যায়। ঈদের দিন বা কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানে পরিবারের সব সদস্য একসঙ্গে ঠিকই বসেছেন, কিন্তু সেখানে কোনো প্রাণবন্ত বা আন্তরিক আলাপ নেই; বরং প্রত্যেকেই যার যার মতো ব্যস্ত নিজ নিজ মুঠোফোনের উজ্জ্বল পর্দায়। কেউ কোণ ঘেঁষে ভিডিও ধারণ করছেন, কেউ নান্দনিক ছবি তুলছেন, আবার কেউ সেই ফ্রেমবন্দি মুহূর্তটি সামাজিক মাধ্যমে আপলোড করে লাইক-কমেন্ট পাওয়ার আশায় ব্যাকুল হয়ে সম্পাদনা বা এডিটিংয়ের কাজে মগ্ন। একই ঘরের চার দেয়ালের ভেতর সশরীরে উপস্থিত থেকেও মানুষ মানসিক দূরত্বের কারণে একে অপরের থেকে মাইলের পর মাইল দূরে সরে যাচ্ছে। বাস্তবের রক্তের সম্পর্কের গভীর উষ্ণ জায়গাটি আজ দখল করে নিচ্ছে সস্তা ভার্চুয়াল উপস্থিতি ও ডিজিটাল রিঅ্যাকশন।
এই বাস্তবতায় এখন একটি বড় প্রশ্ন সমাজবিজ্ঞানীদের সামনে দাঁড়িয়েছে— এটি কি কেবলই সময়ের স্বাভাবিক বিবর্তন নাকি এক গভীর সামাজিক অবক্ষয়ের প্রচ্ছন্ন লক্ষণ?
প্রকৃতপক্ষে, প্রযুক্তিকে কখনোই এককভাবে বা ঢালাওভাবে দায়ী করা যুক্তিযুক্ত নয়। কারণ প্রযুক্তি নিজে কখনোই ভালো বা মন্দ হয় না; এর ব্যবহারকারী মানুষ যেভাবে এটিকে ব্যবহার করে, তার ওপরই এর ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রভাব নির্ভর করে। কিন্তু সমস্যা তখন তীব্র হয়, যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের কৃত্রিম উপস্থিতি বাস্তব জীবনের রক্ত-মাংসের সম্পর্কের চেয়ে মানুষের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও আরাধ্য হয়ে ওঠে, যা বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার জন্য এক চরম উদ্বেগের কারণ। পরিবারে সবাই একসঙ্গে বসেও যদি টু শব্দটি না হয়, বন্ধুদের প্রাণের আড্ডা যদি নিছক ‘সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট’ তৈরির একটি বাণিজ্যিক প্রকল্পে পরিণত হয়, তবে সম্পর্কের স্বাভাবিক ও চিরন্তন উষ্ণতা ধীরে ধীরে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার এক দীর্ঘস্থায়ী ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিশ্বের প্রথিতযশা মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে সতর্ক করে আসছেন যে, মানুষের সুস্থ মানসিক বিকাশ ও সামাজিক সুস্থতার জন্য সরাসরি বা মুখোমুখি সামাজিক যোগাযোগ ও আন্তরিক আলাপ-আলোচনা অত্যন্ত জরুরি। মুখোমুখি বসে কথোপকথন, চোখের ভাষা বোঝা, অনুভূতি ভাগাভাগি এবং একে অপরের প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া মানুষের পারস্পরিক আবেগগত বন্ধনকে ইস্পাতদৃঢ় করে তোলে। অথচ সামাজিক মাধ্যমনির্ভর বর্তমান জীবনধারা সেই মনস্তাত্ত্বিক জায়গাটিকে দিন দিন আরও বেশি সংকুচিত ও অবরুদ্ধ করে ফেলছে। মানুষ এখন ঘরের ভেতরের পরিবারের আপন সদস্যদের সঙ্গে দুটো সুখ-দুঃখের কথা বলার চেয়ে অনলাইন দুনিয়ার অপরিচিত দর্শকদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বা ‘ভিউ’ নিয়ে অনেক বেশি উদগ্রীব ও আগ্রহী।
বাংলাদেশের মতো ঐতিহ্যগতভাবে সুদৃঢ় পারিবারিক বন্ধননির্ভর ও যৌথ পরিবারের সমাজে এই নেতিবাচক পরিবর্তনটি আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ও আশঙ্কাজনক। আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির মূল শক্তিই ছিল পারিবারিক ঐক্য, পারস্পরিক আন্তরিকতা এবং সামাজিক সম্প্রীতি। যদি আমাদের নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে এই প্রাণের আড্ডার সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলে, তবে অদূর ভবিষ্যতে পারিবারিক সম্পর্কের চিরন্তন গভীরতাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা চরম একাকীত্ব ও বিষণ্ণতায় ভুগতে পারেন, শিশুদের সঙ্গে পরিবারের বড়দের আবেগগত সংযোগ বা ইমোশনাল বন্ডিং কমে যেতে পারে এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার ক্ষেত্রটি একসময় সম্পূর্ণ সংকুচিত হয়ে পড়বে।
তবে এই অন্ধকার পরিস্থিতি কিন্তু একেবারেই অপরিবর্তনীয় বা সংশোধন অযোগ্য নয়। মানুষ অবশ্যই সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করবে, আনন্দের জন্য রিলসও তৈরি করতে পারে; কিন্তু এর মাঝে বাস্তব সম্পর্কের চিরন্তন মূল্য যেন কোনোভাবেই ঢাকা পড়ে না যায়। ঈদের দিন কিংবা যেকোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে কিছু সময়ের জন্য হলেও মোবাইল ফোনটি দূরে সরিয়ে রেখে সরাসরি প্রাণখুলে গল্পে মেতে ওঠা, পরিবারের প্রবীণদের অভিজ্ঞতার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং শিশুদের সঙ্গে অনাবিল সময় কাটানো— এসব সুস্থ অভ্যাস আমাদের যান্ত্রিক জীবনে পুনরায় ফিরিয়ে আনা আজ সময়ের দাবি। কারণ একটি ১৫ সেকেন্ডের রিলস হয়তো আপনাকে ক্ষণিকের সস্তা বিনোদন দিতে পারে, কিন্তু একটি আন্তরিক ও প্রাণখোলা আড্ডা আপনার হৃদয়ে তৈরি করতে পারে আজীবনের এক অমূল্য ও মধুর স্মৃতি।
ডিজিটাল যুগের এই তীব্র বাস্তবতায় আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ হলো— ভার্চুয়াল ও বাস্তব জীবনের মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য (Balance) রক্ষা করা। প্রযুক্তি যেন মানুষের সম্পর্ককে আরও সমৃদ্ধ ও সহজ করে, কোনোভাবেই যেন তাকে প্রতিস্থাপন বা ধ্বংস না করে। কারণ জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান ও সুন্দর মুহূর্তগুলো অনেক সময় কোনো কৃত্রিম ক্যামেরার ফ্রেমে বা মেগাপিক্সেলের লেন্সে নয়, মানুষের ভালোবাসায় ভরা হৃদয়ের ভেতরেই সবচেয়ে সুন্দর ও সুরক্ষিতভাবে সংরক্ষিত থাকে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক ও পারিবারিক সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে এই পরম সত্যটি নতুন প্রজন্মকে সাথে নিয়ে আমাদের নতুন করে উপলব্ধি করার সময় এসেছে।
জান্নাত সকালাবেলা
|