খুলনায় শাশুড়ি ও দুই সন্তানকে হত্যার দায় স্বীকার
সরদার সাইদী হাসান বাবু, খুলনা ব্যুরো: খুলনায় সামান্য গালিগালাজের জের ধরে রাগের মাথায় শাশুড়ি এবং ঘটনাটি দেখে ফেলায় একে একে দুই অবুঝ সৎ-সন্তানকে শ্বাসরোধ করে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন ঘাতক রফিকুল ইসলাম হাওলাদার ওরফে রফিক (৩৫)। এই নৃশংস ট্রিপল মার্ডারের দায় স্বীকার করে আজ শনিবার (৬ জুন) দুপুরে খুলনা মহানগর হাকিম মোঃ ফরিদুজ্জামানের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন তিনি। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এর আগে, গত ৩০ মে নগরীর সোনাডাঙ্গা থানার দারুল আমান মসজিদ রোড এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে বেবী বেগম (৬২), তাঁর নাতি শামীম (১৩) ও মুস্তাকিম (৪)-এর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সোনাডাঙ্গা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) অনিমেষ মন্ডল জানান, চার বছর আগে ফাতেমা বেগম মেরীর সাথে তাঁর প্রথম স্বামী মাসুম ব্যাপারীর বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর মেরী তাঁর দুই সন্তান ও মা বেবী বেগমকে নিয়ে সোনাডাঙ্গার ওই বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। কিছুদিন পর মেরী ট্রাকচালক রফিককে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। কিন্তু এই বিয়ে মেরীর মা ও বড় ছেলে শামীম মেনে নিতে পারেননি। এ নিয়ে রফিকের সাথে তাঁর শাশুড়ি ও সৎ-ছেলের প্রায়ই ঝগড়াবিবাদ লেগে থাকত।
আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, গত বৃহস্পতিবার রাতে রফিক ওই বাড়িতে গেলে আবারও পারিবারিক কলহের জেরে তিনি রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। তবে পরদিন শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তিনি আবারও ওই বাসায় ফিরে আসেন। ঘরের দরজা খোলা দেখে ভেতরে ঢুকতে গেলে শাশুড়ি বেবী বেগম তাঁকে দেখা মাত্রই অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে রফিক নিজের গায়ের ওড়না দিয়ে শাশুড়ির মুখ ও নাক চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন।
এই হত্যাকাণ্ডটি সরাসরি প্রত্যক্ষ করে ফেলে ১৩ বছরের সৎ-ছেলে শামীম। ঘটনা জানাজানি হওয়ার ভয়ে তাকেও একই কায়দায় শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন রফিক। শামীমের গোঙানি ও চিৎকারে ঘুম থেকে জেগে ওঠে ৪ বছরের ছোট শিশু মুস্তাকিম। সেও বিছানা থেকে উঠে হত্যার দৃশ্য দেখে ফেললে রফিক ট্রাংকের ওপর রাখা একটি পায়জামা দিয়ে তারও মুখ চেপে ধরে নির্মমভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন।
একই ঘরে তিনজনকে হত্যার পর রফিক ঠান্ডা মাথায় শাশুড়ির লাশ খাটের নিচে, শামীমের লাশ ট্রাংকের ওপর এবং ছোট শিশু মুস্তাকিমের লাশ ওয়ারড্রবের একটি ড্রয়ারের মধ্যে লুকিয়ে রাখেন। এরপর বাইরে থেকে ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে তিনি এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান।
পরিবারের সদস্যদের খোঁজ না পেয়ে স্বজনদের করা অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ওই বাসা থেকে তিনজনের লাশ উদ্ধার করে। এরপরই রফিককে খুঁজতে মাঠে নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত শুক্রবার সকালে বরিশালের কাশিপুর এলাকা থেকে রফিককে গ্রেপ্তার করে র্যাব-৬ এবং রাতেই সোনাডাঙ্গা থানা-পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এই ঘটনায় নিহত দুই শিশুর জৈবিক পিতা মাসুম ব্যাপারী বাদী হয়ে রফিকুল ইসলাম হাওলাদারকে প্রধান আসামি করে সোনাডাঙ্গা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
সোনাডাঙ্গা থানার ওসি (তদন্ত) অনিমেষ মন্ডল বলেন, “আসামি রফিক আদালতে হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দি শেষে তাঁকে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া ও অন্যান্য আইনি কার্যক্রম চলমান রয়েছে।”
এআইএল/সকালবেলা
|