বাকলিয়া এখন অস্ত্র ও মাদকের অভয়ারণ্য, যৌথ অভিযানের দাবি
মোহাম্মদ সোহেল রানা, ব্যুরো চিফ চট্টগ্রাম জেলা: বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানা এলাকা বর্তমানে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি, মাদকের বিস্তার ও সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়েছে। বালু মহালের দখল, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এবং এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এখানে আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্রের মহড়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা। দিন দিন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা কিশোর গ্যাং ও বিভিন্ন সন্ত্রাসী বাহিনীর দৌরাত্ম্যে সাধারণ বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা চরম আতঙ্কের মুখে পড়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাকলিয়ার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটেছে। কর্ণফুলী নদীর তীরের বালু মহালের নিয়ন্ত্রণ এবং শাহ আমানত সেতু সংলগ্ন আন্ডারগ্রাউন্ড আয়ের উৎসের দখল নিয়ে সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর সশস্ত্র সংঘাত থামছেই না। এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জেরে ইতোমধ্যেই ঘটেছে জোড়া হত্যাকাণ্ডের (ডাবল মার্ডার) মতো নৃশংস ঘটনা, যেখানে প্রাণ হারিয়েছেন নির্দোষ পথচারীও। এছাড়া একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপের মুখোমুখি অবস্থান, আগ্নেয়াস্ত্রের প্রকাশ্য ব্যবহার এবং ককটেল বিস্ফোরণে পুরো এলাকা অস্থির হয়ে উঠেছে। মিয়াখান নগর, ময়দার মিল, সৈয়দশাহ রোড ও কালামিয়া বাজার সংলগ্ন এলাকায় ধারালো চাপাতি ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলায় কোমলমতি শিশুসহ সাধারণ পথচারী গুলিবিদ্ধ ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
তদন্ত ও স্থানীয় অনুসন্ধানে দেখা যায়, কর্ণফুলী সেতু সংলগ্ন বাস্তুহারা এলাকা, চাক্তাই, মিয়াখান নগর, ইসাকের পুল, পশ্চিম বাকলিয়া সৈয়দশাহ রোড, বগার বিল, ডিসি রোড, কালামিয়া বাজার এলাকা এবং সৈয়দশাহ পেশকার বাড়ি রোড বর্তমানে মাদকের মূল আখড়ায় পরিণত হয়েছে। অতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় গলি ও ঘিঞ্জি পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে এখানে খুব দ্রুত মাদকের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে অপরাধীরা। গত কয়েক মাসের চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নগরীর এই সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে কোনো দৃশ্যমান বড় ধরনের অস্ত্র উদ্ধার বা মাদকবিরোধী কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা হয়নি। ফলে এই এলাকাগুলোকে সন্ত্রাসীরা তাদের অবাধ অভয়ারণ্য বানিয়ে ফেলেছে।
পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে ৫ আগস্টের পর থেকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় বেশ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী ও গোপন সূত্রে জানা যায়, ওই সময়ে কোতোয়ালি থানাসহ চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন থানায় হামলা ও ভাঙচুরের পর লুণ্ঠিত হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আরও জানা যায়, পুলিশের হাতছাড়া হওয়া সেই লুণ্ঠিত মারণাস্ত্র ও গোলাবারুদ এখন হাতবদল হয়ে বাকলিয়া ও তার আশেপাশের চত্বরে সন্ত্রাসীদের হাতে ঘুরছে। বিশেষ করে বগার বিল, চাক্তাই ভেড়া মার্কেট, সৈয়দশাহ রোড, ইসাকের পুল, ময়দার মিল এবং চন্দনপুরার কিছু এলাকায় এসব লুণ্ঠিত অস্ত্র অপরাধীদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে এবং মাঝেমধ্যেই গভীর রাতে কিংবা আধিপত্য বিস্তারের সময় তা দৃশ্যমান হতে দেখা যায় বলে স্থানীয় বেশ কয়েকটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এলাকাবাসীর তীব্র আশঙ্কা, পুলিশের লুণ্ঠিত এসব আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ সন্ত্রাসীদের হাতে থাকায় এবং মাদকের সাম্রাজ্য অনিয়ন্ত্রিত রয়ে যাওয়ায় যেকোনো মুহূর্তে আবারও একাধিক ডাবল মার্ডারের মতো নৃশংস ঘটনা কিংবা বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ঘটতে পারে। এখনই যদি এসব অবৈধ ও লুণ্ঠিত মারণাস্ত্রের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ হাতের নাগালের বাইরে চলে যাবে।
এই পরিস্থিতিতে বাকলিয়া, চন্দনাপুরা ও পার্শ্ববর্তী চাক্তাই-ভেড়া মার্কেটসহ পুরো এলাকাকে সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত করতে সেনাবাহিনী, এসআরবি (SRB) এবং পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনীর তাৎক্ষণিক বিশেষ চিরুনি ও অস্ত্র উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার, মাদকের আখড়া গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে না পারলে বন্দরনগরীর এই গুরুত্বপূর্ণ জনপদে স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়বে।
এআইএল/সকালবেলা