ফেসবুকে নায়কের রূপ, আড়ালে চট্টগ্রামের আতঙ্কের নাম: কে এই ‘ডেভিড ইমন’?

প্রকাশ: বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩১ অপরাহ্ণ
ফেসবুকে নায়কের রূপ, আড়ালে চট্টগ্রামের আতঙ্কের নাম: কে এই ‘ডেভিড ইমন’?
চট্টগ্রামের অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রক মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন। (ছবি: সংগৃহীত)

নিজস্ব প্রতিবেদক: হাতে দামি ঘড়ি, চলাফেরায় রাজকীয় আভিজাত্য, টিকটক ও ফেসবুকে লাখের ওপর অনুসারী—বাহ্যিক দৃষ্টিতে দেখে মনে হতে পারে যেন রুপালি পর্দার কোনো নায়ক। কিন্তু এই গ্ল্যামারাস ও চকচকে চেহারার আড়ালেই আড়ালে লুকিয়ে ছিল বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক অপরাধজগতের প্রধান আতঙ্ক মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ‘ডেভিড ইমন’।

বিদেশে পলাতক চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’-এর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে পুরো চট্টগ্রামজুড়ে একের পর এক চাঁদাবাজি, প্রকাশ্যে ব্রাশফায়ার, সশস্ত্র হামলা ও চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন তিনি।

সর্বশেষ নগরের চকবাজার থানার চন্দনপুরা-বাকলিয়া এক্সেস সড়কে অবস্থিত ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডিডিএন’ (ডিজিটাল ডট নেট)-এ দিনদুপুরে ফিল্মি স্টাইলে তাণ্ডব চালিয়ে ৩৫ লাখ টাকা লুটের ঘটনায় নতুন করে ভয়াবহ আতঙ্কের শীর্ষে উঠে আসেন এই সন্ত্রাসী।

ডিডিএনের স্বত্বাধিকারী আদিল বিন মামুন জানান, সম্প্রতি একটি বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে ফোন করে নিজেকে ডেভিড ইমন পরিচয় দিয়ে এককালীন ২ কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা নিয়মিত চাঁদা দাবি করা হয়। ফোন কলে ইমনের কড়া হুমকি ছিল, "ব্যবসা চালাতে হলে এককালীন ২ কোটি টাকা দেবেন। না হলে এখন থেকে আমার ক্যাডাররা আপনার ব্যবসা চালাবে। আমার ডিটেইলস জানতে চাইলে সরাসরি পুলিশ কমিশনারকে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন।"

চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর ঠিক দুদিন পর, গত ১৩ জুলাই সোমবার দুপুরে ২০-৩০ জনের একটি সশস্ত্র গ্যাং মুখে মাস্ক পরে ডিডিএন কার্যালয়ে বেপরোয়া হামলা চালায়, ভাঙচুর করে এবং কর্মচারীদের বেতনের জন্য রাখা নগদ ৩৫ লাখ টাকা লুট করে নেয়। এর কিছুদিন আগেই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডে ২০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের ১০তলা নির্মাণাধীন ভবনে ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলি চালায় ইমনের ক্যাডাররা, যার ফলে ভবনটির নির্মাণকাজ এখনো সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

কে এই ডেভিড ইমন?

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, মোবারক হোসেন ইমনের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগরে। তার বাবা মো. মুসা একজন সাধারণ কৃষক। লেখাপড়ায় বেশিদূর না এগোনো ইমন কিশোর বয়সেই স্থানীয় গ্যাং কালচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অপরাধজগতে তাঁর দ্রুত উত্থান ঘটে। বিদেশে অবস্থানরত বড় সাজ্জাদের ক্যাডার বাহিনীতে যোগ দিয়ে পরপর কয়েকটি নৃসংংশ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে সাজ্জাদের প্রধান ট্রাস্টেড ম্যান হয়ে ওঠেন। বর্তমানে সাজ্জাদ বাহিনীর অর্ধশতাধিক সশস্ত্র তরুণের একটি ক্যাডার গ্যাং সরাসরি পরিচালনা করছিলেন তিনি।

পুলিশের তথ্যমতে, গত মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ইমনের বিরুদ্ধে অন্তত সাতটি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। যার মধ্যে ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট আনিস ও হাসানকে প্রকাশ্যে ব্রাশফায়ারে হত্যা, ২০২৫ সালের মার্চে বাকলিয়ার আলোচিত জোড়া খুন এবং পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে ‘ঢাকাইয়া আকবর’ হত্যাকাণ্ড অন্যতম। উদ্ধারকৃত তথ্য অনুযায়ী, ইমনের কাছে সর্বাধুনিক অন্তত ১৫ থেকে ২০টি ভারী আগ্নেয়াস্ত্রের অ্যাক্সেস ছিল।

ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে গত এক মাসেই প্রায় দেড় কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায় করেছে ইমন বাহিনী। অক্সিজেন, মুরাদপুর, জিইসির মোড় ও পাঁচলাইশ এলাকার ব্যবসায়ীরা আতঙ্কের মুখে নীরবে চাঁদা দিতে বাধ্য হচ্ছিলেন। এ নিয়ে সম্প্রতি চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছিল ‘ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (আইএসপিএবি)।

অবশেষে ধরাশায়ী ডেভিড ইমন:

অবশেষে চট্টগ্রামের এই মূর্তিমান আতঙ্কের পতন ঘটেছে। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দিবাগত রাত ৩টার দিকে যশোর জেলার ধুমধুমপুর এলাকায় একটি গোপন আস্তানায় যৌথ অভিযান চালিয়ে মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে, সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যশোর ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ যৌথভাবে চেকপোস্ট বসিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গ্রেপ্তারকৃত ডেভিড ইমনকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন