হিট স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের মধ্যে পার্থক্য কী
লাইফস্টাইল ডেস্ক : গ্রীষ্মের তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের কারণে বর্তমানে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে জনজীবন ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অতিরিক্ত গরম আবহাওয়া মানুষের হৃৎপিণ্ড এবং স্বাভাবিক রক্তসংবহনতন্ত্রের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করার ফলে হিট স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের মতো ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেহেতু এই দুটি জটিল শারীরিক সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একে অপরের সাথে অনেকটাই মিলে যায়, তাই সাধারণ মানুষের মধ্যে এটি নিয়ে বিভ্রান্তি বা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। তবে সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত করতে না পারলে তা রোগীর জীবনের জন্য চরম বিপদ ডেকে আনতে পারে।
আজ বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সকাল ১১টা ২১ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘লাইফস্টাইল’ ও ‘স্বাস্থ্য সচেতনতা ও ঘরোয়া চিকিৎসা গাইড’ বিভাগের যৌথ বিশেষ প্রতিবেদনে হিট স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাকের মধ্যকার মূল বৈজ্ঞানিক পার্থক্য ও তাৎক্ষণিক করণীয় বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য বার্তা অনুযায়ী, যখন মানবদেহ অতিরিক্ত গরম আবহাওয়ার কারণে তার অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না এবং শরীর থেকে বাড়তি তাপ ঘামের মাধ্যমে বের করে দিতে পুরোপুরি অক্ষম হয়, তখনই মানুষের শরীরে মূলত ‘হিট এক্সহশন’ এবং পরবর্তীতে জীবনঘাতী ‘হিট স্ট্রোক’-এর ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে যায়। হিট স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাক দুটিই অত্যন্ত জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি (Medical Emergency) হলেও এগুলো সৃষ্টির পেছনের কারণ এবং শরীরের সতর্ক সংকেত বা উপসর্গগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন।
হিট স্ট্রোক: মানুষের শরীর যখন বিপজ্জনক ও অস্বাভাবিক উপায়ে অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়, তখন হিট স্ট্রোক ঘটে। এটি সাধারণত তীব্র রোদের সংস্পর্শে থাকা, শরীরে চরম পানিশূন্যতা (Dehydration) তৈরি হওয়া অথবা গরম আবহাওয়ার মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর পরিশ্রম করার কারণে ঘটে থাকে।
হার্ট অ্যাটাক: এটি সম্পূর্ণ হৃদযন্ত্রের একটি রোগ। যখন হৃৎপিণ্ডের ভেতরের ধমনিতে রক্ত প্রবাহ কোনো কারণে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত বা বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে হৃৎপেশীতে প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের সরবরাহ সম্পূর্ণ কমে যায়, তখনই একজন মানুষ হার্ট অ্যাটাকের শিকার হন।
লক্ষণ ও উপসর্গের সুনির্দিষ্ট তফাত
হিট স্ট্রোকের ক্ষেত্রে রোগীর শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বেশিরভাগ সময়েই ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটের উপরে উঠে যায়। এই অবস্থায় আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে যে লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়:
আক্রান্ত ব্যক্তির ত্বক প্রচণ্ড গরম ও শুষ্ক হয়ে যায় অথবা হঠাত করে অতিরিক্ত ঘাম হওয়া শুরু হতে পারে। তীব্র মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব বা অনবরত বমি হওয়া এবং চরম শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। সাময়িকভাবে মানসিক বিভ্রান্তি বা চট করে কাউকে চিনতে না পারার মতো ঘটনা ঘটে এবং হৃৎস্পন্দন বা পালস রেট অস্বাভাবিক দ্রুত হয়ে যায়। গুরুতর বা চরম পর্যায়ে আক্রান্ত ব্যক্তি কোনো পূর্ব সংকেত ছাড়াই অচেতন (Unconscious) হয়ে পড়তে পারেন অথবা তার শরীরে খিঁচুনি দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে, হার্ট অ্যাটাক মূলত সরাসরি মানুষের হৃৎপিণ্ড এবং রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর প্রধান সাধারণ লক্ষণগুলো হলো
বুকের ঠিক মাঝখানে বা বাম পাশে তীব্র ও অসহ্য ব্যথা, প্রচণ্ড চাপ বা বুক আঁটসাঁট হয়ে আসার অনুভূতি হওয়া।বুকের সেই তীব্র ব্যথা ক্রমশ বাম হাত, ঘাড়, চোয়াল, পিঠ বা দুই কাঁধের দিকে ছড়িয়ে পড়া।তীব্র শ্বাসকষ্ট হওয়া, শরীর ঠান্ডা হয়ে ঠান্ডা ঘাম বের হওয়া এবং হঠাৎ করে শরীর অবশ বা দুর্বল হয়ে যাওয়া। তবে চিকিৎসকেরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, হৃদরোগে আক্রান্ত সবার লক্ষণ এক নাও হতে পারে। বিশেষ করে নারী এবং ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে বুকে কোনো ধরনের তীব্র ব্যথা ছাড়াই কেবল অতিরিক্ত ক্লান্তি, বদহজম কিংবা হালকা বুকের অস্বস্তির মতো কিছু অস্বাভাবিক বা নীরব লক্ষণ (Silent Symptoms) দেখা দিতে পারে।
জরুরি মুহূর্তে কখন কী করবেন
যদি আপনার সামনে কোনো ব্যক্তির মধ্যে হিট স্ট্রোকের লক্ষণ প্রকাশ পায়, তবে প্রথম কাজ হলো তাকে অবিলম্বে রোদ থেকে সরিয়ে একটি ঠান্ডা, ছায়াযুক্ত বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্থানে নিয়ে যাওয়া। এরপর ফ্যান বা ভেজা কাপড় দিয়ে দ্রুত তার শরীর ঠান্ডা করার প্রাথমিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আর যদি কোনো ব্যক্তির হার্ট অ্যাটাক হয়েছে বলে সন্দেহ হয়, তবে এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে জরুরি অ্যাম্বুলেন্স বা কার্ডিয়াক হাসপাতালের চিকিৎসা শুরু করতে হবে। কারণ হার্ট অ্যাটাকের পর দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে তা হৃদপেশীর স্থায়ী ক্ষতি রোধ করে রোগীকে বাঁচাতে সাহায্য করে। উভয় ক্ষেত্রেই চিকিৎসায় সামান্য অবহেলা বা দেরি করা রোগীর জন্য জীবনঘাতী হতে পারে।
জান্নাত সকালবেলা
|