জ্বর, টমেটোভর্তা আর শৈশবের ছিটা রুটির অম্লমধুর গল্প

প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ০৩:১৬ অপরাহ্ণ
জ্বর, টমেটোভর্তা আর শৈশবের ছিটা রুটির অম্লমধুর গল্প
লাইফস্টাইল প্রতিবেদক:তখন আমি পুরোদমে স্কুলে পড়ি। সে সময়কার একটা নিয়ম ছিল, জ্বর হলে শরীরকে কম্বল চাপা দিয়ে ঘামিয়ে শুইয়ে রাখতে হতো। গোসল করা সম্পূর্ণ নিষেধ ছিল, আর ভাত খাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না—সোজা ‘নো ভাত’ থিওরি! আজকের চিকিৎসা বিজ্ঞানের দিকে তাকালে অবাক লাগে, কীভাবে পুরো থিওরিটাই উল্টে গেছে। এখন জ্বর বেশি হলে ডাক্তাররা সোজা স্নানঘরে নিয়ে ঝরনার নিচে দাঁড় করিয়ে দেন এবং ভাতের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞাই রাখেন না। আমার জীবনে জ্বরও কম হয়নি, আর বাঙালি হিসেবে ভাত তো বছরের ৩৬৫ দিনই খাই। তবু আজ এত বছর পার হয়ে গেলেও সেই বিশেষ দিনটির কথা আমি কোনোদিন ভুলিনি।

তিন–চার দিনের একটানা জ্বরে শরীর তখন পুরোপুরি কাবু। এর মধ্যে সকাল-দুপুর-রাত শুধু পাউরুটি, স্যুপ আর হরলিকস খেতে খেতে মুখে চড়া পড়ে গেছে—কাঁহাতক সহ্য হয় এসব ছাইপাশ? সেদিন দুপুরবেলা ভারী খাওয়া-দাওয়া শেষে বাসার সবাই যে যার মতো ঘুমিয়ে পড়েছে। কেউ কেউ আবার বাসার বাইরে গেছেন কাজে কিংবা ইউনিভার্সিটির ক্লাসে। আমার শরীরের উত্তাপও তখন একটু কমতির দিকে। অনেক দিন ভাত না পাওয়ায় মনটা ভাতের জন্য প্রচণ্ড আনচান করছিল।

কাউকে কিছু না বলে চুপি চুপি বিছানা থেকে উঠলাম। নিজের বাড়িতেই চোরের মতো পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলাম। ঢাকার আসাদ গেটের নিউ কলোনির আমাদের সেই ছোট্ট ডুপ্লেক্স বাসার রান্নাঘরটা ছিল নিচতলায়। রান্নাঘরে গিয়ে হাঁড়ি খুলতেই দেখি, তখনো ভাত বেশ উষ্ণ ও ধোঁয়া ওঠা। ঠিক পাশেই একটা বাটিতে ঢাকনা দেওয়া টসটসে লাল টমেটোর ভর্তা।:

পাকা টমেটোগুলো ছোট ছোট টুকরা করে সামান্য লবণ দিয়ে প্রথমে সেদ্ধ করে নিতে হয়। তারপর কাঁচা মরিচকুচি, পেঁয়াজকুচি, স্বাদ বুঝে সামান্য লবণ দিয়ে হাত দিয়ে খুব ভালো করে মেখে নিতে হয়। সবশেষে ওপর থেকে খাঁটি শর্ষের তেল ছড়িয়ে আরেকবার মেখে নেওয়া। ওরে স্বাদ! জ্বরঠোসা মুখে আমার মনে হচ্ছিল, এই সাধারণ খাবারটিই বুঝি এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম খাবার।

চারপাশে চোরের মতো তাকাতে তাকাতে এদিক–ওদিক চেয়ে গপগপ করে কয়েক লোকমা ভাত মুখে পুরে দিলাম। চিবিয়ে খাওয়ার মতো তখন পর্যাপ্ত সময় নাই রে ভাই, কে কোথা থেকে এসে দেখে ফেলে সেই ভয়! বলা যায়, টপাটপ গিলেই ফেললাম। আহ্, কী যে স্বর্গীয় শান্তি! ঝটপট বাসন–চামচ ধুয়ে, যেখানকার ঢাকনা সেখানে ঠিকঠাক দিয়ে অপরাধের কোনো চিহ্ন না রেখেই আবার বিছানায় গিয়ে ভালো মানুষের মতো শুয়ে পড়লাম।

বাড়ির কেউ কিচ্ছু টের পেল না ঠিকই, কিন্তু সন্ধ্যার পর থার্মোমিটারের পারদ আবার তরতরিয়ে ওপরে উঠে গেল। তীব্র জ্বরে কাবু হয়ে কম্বলের ভেতর কাঁপতে কাঁপতে শুনি, মা–খালারা বাইরে বলাবলি করছেন, ‘দুপুরে জ্বরটা তো একদম নেমে গিয়েছিল, আবার যে কেন হঠাৎ উঠল!’ আমি কম্বলের নিচে মনে মনে নিজেকে বলছিলাম—লুকিয়ে টমেটোভর্তা দিয়ে ভাত খাওয়ারই ফল এটা। এক ধরণের তীব্র অপরাধবোধ ও আত্মগ্লানিতে মরে যাচ্ছিলাম তখন। যদিও অনেক বড় হয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সূত্রে জেনেছি, ভাত খাওয়ার সঙ্গে জ্বরের বাড়া-কমার কোনো সম্পর্কই ছিল না, বেচারা নির্দোষ টমেটোভর্তাও ছিল সম্পূর্ণ নির্অপরাধ। জীবনে বহুবার বহু দামী দামী খাবার ও টমেটোভর্তা খেয়েছি। কিন্তু আজও চোখে ভাসে সেই নির্জন দুপুরের কথা, সাধারণ রন্ধনপ্রণালির সেই অসাধারণ ও অবিস্মরণীয় স্বাদের কথা।

স্কুলজীবনের আরও একটা বড় নস্টালজিয়া ছিল আমাদের গরমের ছুটি কিংবা ঈদের ছুটি। ছুটি পেলেই সোজা নরসিংদীতে দাদুর বাড়ি বেড়াতে যাওয়া। সেখানে সকালে ঘুম থেকে উঠেই একটা স্বর্গীয় নাশতা খেতাম—ছোট ছোট গোল আলু দিয়ে কচি বাচ্চা মুরগির পাতলা ঝোল, আর সাথে ধোঁয়া ওঠা গরম–গরম ছিটা রুটি। এটি মূলত নরসিংদী অঞ্চলের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী একটি সকালের নাশতা।

আজ ষাটোর্ধ্ব জীবনে এসে পৃথিবীর কত ধরনের নামী-দামী নাশতা খেয়েছি। বাড়িতে তৈরি প্রতিদিনের সাধারণ আলুভাজা, হাতের আটার রুটি থেকে শুরু করে ছুটির দিনের বিশেষ বউ খুদ, শুঁটকিভর্তা কিংবা ল্যাটকা খিচুড়ি আর ডিমভাজা; এমনকি পাঁচ তারকা হোটেলের রাজকীয় বুফে ব্রেকফাস্ট—কোনো কিছুই বাদ যায়নি। কিন্তু শৈশবের সেই ছিটা রুটি আর মুরগির পাতলা ঝোল স্মৃতির পাতায় তার আভিজাত্য ও গৌরব আজও একই আসনে ধরে রেখেছে। দারুণ তার স্বাদ!

এখনো চোখের সামনে ভাসে, খেত থেকে সদ্য তুলে আনা ছোট ছোট লাল টোমাটোমা আলুগুলো সেদ্ধ করে ছাল ছাড়িয়ে বাটিতে রাখা হতো। বাড়ির উঠোনে ঘুরে বেড়ানো পালা মুরগি থেকেই একটা ছোট মুরগি কেটে ধুয়ে পরিষ্কার করে অল্প তেল–মসলা দিয়ে পাতলা ঝোল করা হতো। আর সেই ঝোলে যোগ হতো খেতের লাল আলু।

ঘরের ঘুলঘুলিতে বাসা বাঁধা কবুতরের বাক–বাকুম ডাক শুনতে শুনতে যখন ঘুম থেকে উঠতাম, দেখতাম দাদুর কড়া নির্দেশে মুরগির ঝোল একদম তৈরি। কিন্তু না, ছিটা রুটির দেখা মিলত না তখনো। চালের গুঁড়া, মাটির চুলা, নারকেলের আইচার ডাবুর (একধরনের চামচ), কলাগাছের ডাল দিয়ে তৈরি ব্রাশ আর লোহার কড়াই—সব সরঞ্জাম তখন রেডি।

পরিবারের সবাই যখন একসাথে পাটি পেতে খেতে বসতাম, ঠিক তখনই শুরু হতো রুটি তৈরির আসল খেলা। লবণ–পানি আর চালের গুঁড়ার পাতলা মিশ্রণকে নারকেলের ডাবুর দিয়ে খুব ভালো করে মিশিয়ে নেওয়া হতো। এরপর কড়াইতে কলাগাছের তৈরি ব্রাশ দিয়ে নামমাত্র তেল মাখিয়ে হাত দিয়ে চমৎকার কৌশলে চালের মিশ্রণটি কড়াইয়ের চারধারে ছিটিয়ে ছিটিয়ে দেওয়া হতো।

সেকেন্ড কয়েকের মধ্যে রুটির পিঠ উল্টিয়ে গরম–গরম প্লেটে পরিবেশন করা হতো—যাকে আমরা আজকের যুগে বলি ‘রীতিমতো লাইভ কিচেন’। রুটির চেহারাটা দেখতে হতো ঠিক জালির মতো। টলটলা ও মসলাদার ঝোলে ডুবিয়ে যাঁরা এই গরম ছিটা রুটি জীবনে একবারের জন্যও খেয়েছেন, তাঁরাই কেবল জানেন এর ভেতরের কী অপূর্ব ও স্বর্গীয় স্বাদ!

জীবনে কত রাজকীয় খাবার খেয়েছি, এখনো খাচ্ছি। কিন্তু আজকে যখন স্মৃতির খাতা খুলে লিখতে বসলাম, তখন কেন যেন এই পঞ্চান্ন বছর আগের জ্বরমুখের টমেটোভর্তা আর দাদুর বাড়ির লাইভ কিচেনের ছিটা রুটিই মনের সব প্রতিযোগিতায় জয়যুক্ত হলো। এর আসল বৈজ্ঞানিক বা মনস্তাত্ত্বিক উত্তর হয়তো কোনো বড় মনোবিজ্ঞানীরাই ভালো দিতে পারবেন!

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন