পাখির ঝাঁককে ড্রোন ভেবে লিথুয়ানিয়ায় ছুটল ন্যাটোর যুদ্ধবিমান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পাখির ঝাঁককে ভুল করে শত্রু ড্রোন মনে করে চরম উত্তেজনার মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে আকাশে উড়ে গেল পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর একটি অত্যাধুনিক সুপারসনিক যুদ্ধবিমান। এই আকস্মিক সতর্কতার জেরে রাশিয়ার সীমান্তবর্তী বাল্টিক দেশ লিথুয়ানিয়ার রাজধানী ভিলনিয়াস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
রাশিয়ার বার্তা সংস্থা আরটি ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ঘটনাটি ঘটে গত ১৩ সেপ্টেম্বর। সেদিন ভিলনিয়াস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আকাশসীমার কাছে রাডারে একটি সন্দেহভাজন ড্রোনের গতিবিধি শনাক্ত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। তাৎক্ষণিকভাবে বেসামরিক ফ্লাইটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিমানবন্দরটির সকল উড্ডয়ন ও অবতরণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর প্রায় ৪০ মিনিট পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বিমানবন্দরটি পুনরায় খুলে দেওয়া হয়।
লিথুয়ানিয়ার ন্যাশনাল ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টারের (এনসিএমসি) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়, রাডারে সতর্কবার্তা পাওয়ার পরপরই দেশটির উত্তরাঞ্চলের শিয়াউলিয়াই বিমানঘাঁটি থেকে ন্যাটোর একটি যুদ্ধবিমান দ্রুত উড্ডয়ন করে। আকাশে পৌঁছে পাইলট সরাসরি প্রত্যক্ষ করে নিশ্চিত করেন যে, সংকেত সৃষ্টিকারী উড়ন্ত বস্তুটি কোনো ড্রোন বা শত্রু আকাশযান নয়, বরং তা ছিল একটি বিশাল পাখির ঝাঁক।
এনসিএমসি আরও ব্যাখ্যা করে জানায়, প্রাথমিক স্তরে সামরিক রাডার শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় দূর থেকে উড়ে আসা পাখির ঝাঁক এবং ছোট আকারের নজরদারি বা আত্মঘাতী ড্রোনের সিগন্যালের চিহ্ন প্রায় একই রকম দেখা যায়। ফলে এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল শনাক্তকরণের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে শিয়াউলিয়াই বিমানঘাঁটিতে ন্যাটোর 'বাল্টিক এয়ার পুলিশিং' মিশনের অংশ হিসেবে মোতায়েন রয়েছে ইতালি বিমানবাহিনীর কয়েকটি ইউরোফাইটার টাইফুন যুদ্ধবিমান। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি ইউরোফাইটার টাইফুন যুদ্ধবিমান আকাশে মাত্র এক ঘণ্টা ওড়াতে প্রায় ৬৫ হাজার মার্কিন ডলার ব্যয় হয়। নিছক একটি পাখির ঝাঁক যাচাই করতেই সামরিক জোটকে এই বিশাল অর্থ খরচ করতে হলো।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে বাল্টিক দেশগুলোর আকাশসীমায় উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ সংলগ্ন লেনিনগ্রাদ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ইউক্রেন দূরপাল্লার ড্রোন হামলা জোরদার করার পর থেকেই লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়ার আকাশসীমা দিয়ে ড্রোনের আনাগোনা ও বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এর আগে গত মাসে লাটভিয়ার আকাশসীমায় প্রবেশ করা একটি ড্রোনকে ন্যাটোর যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করার দাবি করেছিল। ন্যাটোর ভাষ্য ছিল, রুশ ইলেকট্রনিক জ্যামিং ব্যবস্থার কারণে দিকভ্রান্ত হয়ে ড্রোনটি সেখানে ঢুকে পড়েছিল।
তবে মস্কো শুরু থেকেই লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়াকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছে। রাশিয়ার কর্মকর্তাদের স্পষ্ট দাবি, বাল্টিক দেশগুলো যদি ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় নিজেদের আকাশ বা ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেয়, তবে তা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার শামিল হবে এবং সে ক্ষেত্রে মস্কো জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী আত্মরক্ষামূলক যেকোনো কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
ইউরোপজুড়ে ড্রোন আতঙ্কের গভীরতা ক্রমেই বাড়ছে। সম্প্রতি লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস) এক প্রতিবেদনে জানায়, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটির কাছে গত কয়েক মাসে অন্তত ১৪৪ বার অচেনা নজরদারি ড্রোন শনাক্ত হয়েছে। তবে রাশিয়া এতে তাদের যেকোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করে জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট থেকে সাধারণ মানুষের মনোযোগ সরাতেই ন্যাটো ও ইউরোপীয় দেশগুলো প্রতিনিয়ত এসব রুশ জুজু তৈরি করছে।