সমকামী সহিংসতা রুখতে ৩৭৭ ধারা কার্যকরের দাবি ৬০০ আলেমের

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৩ পূর্বাহ্ণ
সমকামী সহিংসতা রুখতে ৩৭৭ ধারা কার্যকরের দাবি ৬০০ আলেমের
প্রতীকী

সাভারের একটি মাদ্রাসায় সাত বছর বয়সী এক কোমলমতি শিক্ষার্থীর ওপর যৌন নিপীড়নের বর্বরোচিত ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে ‘সমকামী সহিংসতা’ প্রতিরোধে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা কঠোরভাবে কার্যকর করার জোর দাবি জানিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম, শতাধিক মাদ্রাসার মুহতামিমসহ ৬০০ জন বিশিষ্ট আলেম।

আজ মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সামাজিক প্ল্যাটফর্ম ‘মূল্যবোধ আন্দোলন’-এর চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেনের মাধ্যমে গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে দেশের শীর্ষ আলেম সমাজ এ দাবি জানান।

বিবৃতিতে শীর্ষ আলেমরা উল্লেখ করেন, সাভারের একটি দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাত বছর বয়সী এক নিষ্পাপ শিক্ষার্থীর ওপর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দ্বারা একাধিকবার যৌন নিপীড়নের ন্যাক্কারজনক খবরে তাঁরা গভীরভাবে মর্মাহত ও উদ্বিগ্ন। দ্বীনি ও নৈতিক মূল্যবোধের পবিত্র অঙ্গনে এ ধরনের চরম বিকৃত অপরাধ নৈতিক অবক্ষয়ের পাশাপাশি শিশু শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।

আলেমরা সুস্পষ্টভাবে বলেন, ইসলামের দৃষ্টিতে সকল প্রকার অনৈতিক শারীরিক সম্পর্ক, প্রকৃতিবিরুদ্ধ বিকৃতি ও যৌন নিপীড়ন—বিশেষত সমকামিতা কঠোরভাবে হারাম ও গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ। কোমলমতি শিশুদের ওপর সমকামী সহিংসতায় লিপ্ত হওয়া ব্যক্তি শিক্ষক কিংবা ছাত্র যে-ই হোক না কেন, তাদের সাথে ইসলামের মৌলিক আদর্শ কিংবা মাদ্রাসার পবিত্র দ্বীনি আবহের দূরতম কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না।

গবেষণামূলক তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বিবৃতিতে দাবি করা হয়, সমাজে সমকামী ও উভকামী মানসিকতার ব্যক্তিদের মাধ্যমে শিশুদের যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেশি থাকে। তাই সামাজিকভাবে সমকামী প্রবণতা কঠোর হস্তে দমন করা না গেলে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ কোনো স্তরেই শিশুদের মৌলিক শারীরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, বিগত কয়েক বছর ধরে পশ্চিমা অর্থায়নে পরিচালিত কিছু এনজিওর মাধ্যমে সমকামী সংস্কৃতিকে স্বাভাবিকীকরণের অপচেষ্টা দৃশ্যমান হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ডিজিটাল অ্যাপের মাধ্যমে সমকামী চক্রের জাল বিস্তৃত হচ্ছে এবং অপরাধ দমনে ব্রিটিশ আমল থেকে বহাল থাকা দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারাকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। ফলে এই বিকৃতির বিষবাষ্প সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করছে। মাদ্রাসা কোনো বিচ্ছিন্ন সমাজ নয় উল্লেখ করে তাঁরা বলেন, বৃহত্তর সমাজে অবক্ষয়ের বিস্তার ঘটলে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও সেই সামাজিক ব্যাধির ঝুঁকি থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকতে পারে না।

আইনি প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বিবৃতিতে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, ১৫৩৩ সালে ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরির শাসনামলে প্রকৃতিবিরুদ্ধ যৌন অপরাধের বিরুদ্ধে ‘Buggery Act 1533’ প্রণয়ন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোতে একই ধারণার ভিত্তিতে ৩৭৭ ধারার অবতারণা করা হয়, যা বর্তমানে বাংলাদেশের দণ্ডবিধিতেও বহাল রয়েছে। ৯২ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত এ দেশে কুরআন-সুন্নাহর আইন প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত সামাজিক অবক্ষয় ও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান ৩৭৭ ধারার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব।

সাভারের ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে আলেমরা বলেন, এই পৈশাচিক ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত প্রত্যেক অপরাধীকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে ৩৭৭ ধারাসহ অন্যান্য প্রযোজ্য ধারায় মামলা রুজু করে দৃষ্টান্তমূলক ও সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে, যেন ভবিষ্যতে কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিয়ে এমন হীন অপরাধের দুঃসাহস না দেখায়। একই সাথে দেশে সমকামিতা প্রসারে অর্থায়ন ও প্রচারণায় যুক্ত এনজিওগুলোর বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান তাঁরা।

যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী বিশিষ্ট আলেমদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মুহাম্মাদ আবদুল মালেক, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক, ড্যাফোডিল ইসলামিক সেন্টারের পরিচালক প্রফেসর মোখতার আহমাদ, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মসজিদুত তাকওয়া ধানমন্ডির খতিব মুফতি সাইফুল ইসলাম, সায়েন্সল্যাব বায়তুল মামুর জামে মসজিদের খতিব মাওলানা হাসান জামিল, মসজিদুল জুমা কমপ্লেক্স পল্লবীর খতিব আব্দুল হাই মুহাম্মাদ সাইফুল্লাহ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমির মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি মাসউদুল করীম, মারকাযু দিরাসাতিল ইকতিসাদিল ইসলামীর মুহতামিম ড. মুফতি ইউসুফ সুলতান এবং জামেয়া মাহমুদিয়া যাত্রাবাড়ীর মুফতি রেজাউল কারীম আবরারসহ শীর্ষ ওলামায়ে কেরাম।

মন্তব্য করুন