আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র কূটনৈতিক চাপ, ব্ল্যাকমেইল ও ভিসা বাতিলের সরাসরি হুমকির মুখে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সহ-সভাপতি পদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন ফিলিস্তিনের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত রিয়াদ মনসুর। ফিলিস্তিনি প্রতিনিধি দলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মার্কিন ভিসা বাতিল করার হুমকি দেওয়ার পর রামাল্লা এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে বলে মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এনপিআর এক বিশেষ প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এ খবর জানিয়েছে।
জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন চাপের মুখে ফিলিস্তিনি প্রতিনিধি দল একটি মধ্যস্থতাকারী আরব দেশের মাধ্যমে বার্তা পাঠিয়েছে যে, রিয়াদ মনসুর আগামী দুই বছর সাধারণ পরিষদের সহ-সভাপতি পদের জন্য আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না। ফিলিস্তিনের আকস্মিক সরে দাঁড়ানোর ফলে ওই শূন্য আসনে এখন আরব গ্রুপ থেকে লেবাননের রাষ্ট্রদূত লড়বেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির প্রধান মুখপাত্র লা নেইস কলিন্স ইতোমধ্যে ফিলিস্তিনের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি অভ্যন্তরীণ গোপন কূটনৈতিক বার্তা বা কেবল-এর সূত্র ধরে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার জেরুজালেমে নিযুক্ত মার্কিন কূটনীতিকদের ওয়াশিংটন থেকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল যেন তাঁরা ফিলিস্তিনি শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর এই প্রার্থিতা প্রত্যাহারের জন্য সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করেন। হোয়াইট হাউসের দাবি, রিয়াদ মনসুর যদি সাধারণ পরিষদের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন, তবে তা গাজা ভূখণ্ড ও ফিলিস্তিন নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন ভূ-রাজনৈতিক পরিকল্পনাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত বা ক্ষুণ্ণ করবে।
মার্কিন ওই গোপন বার্তায় স্পষ্ট করে ফিলিস্তিনকে আলটিমেটাম দিয়ে বলা হয়, “ফিলিস্তিনি প্রতিনিধি দল যদি সাধারণ পরিষদের সহ-সভাপতি পদের প্রার্থিতা অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার না করে, তবে এর জন্য ওয়াশিংটন সরাসরি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে (পিএ) দায়ী করবে এবং এর পরিণতি ভালো হবে না।”
মার্কিন প্রশাসন ফিলিস্তিনকে আরও মনে করিয়ে দেয় যে, গত বছর নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের জন্য ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এবং তাঁর সফরসঙ্গী আরও ৮০ জন শীর্ষ ফিলিস্তিনি কর্মকর্তার এন্ট্রি ভিসা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ফলে এবারও ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদের অবরুদ্ধ করতে ভিসা বাতিলের মতো প্রয়োজনীয় যেকোনো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প মার্কিন প্রশাসনের হাতে রয়েছে। এ বিষয়ে নিউইয়র্কে নিযুক্ত ফিলিস্তিনি মিশনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসেও তীব্র মার্কিন ও ইসরায়েলি লবিংয়ের মুখে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদের হেভিওয়েট লড়াই থেকেও নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন এই রিয়াদ মনসুর। সে সময় ফিলিস্তিনি মিশনের পক্ষ থেকে পর্দার আড়ালের চাপের কথা চেপে গিয়ে শুধু বলা হয়েছিল, 'ফিলিস্তিনের বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির' কারণে তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী ২ জুন সাধারণ পরিষদের সভাপতি এবং ১৬টি সহ-সভাপতি পদের ভাগ্য নির্ধারণী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের মে মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একটি নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক প্রস্তাব পাশ হয়েছিল, যার মাধ্যমে পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অধিকার ও সাধারণ পরিষদে অংশগ্রহণ ব্যাপক পরিসরে বৃদ্ধি করা হয়। এর ফলে ফিলিস্তিন জাতিসংঘের যেকোনো আলোচ্যসূচিতে স্বাধীনভাবে বক্তব্য রাখার এবং খসড়া প্রস্তাবে সংশোধনী আনার আইনি অধিকার পায়। পাশাপাশি সাধারণ পরিষদের অধিকাংশ সদস্য দেশ ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ দেওয়ার পক্ষে জোরালো ভোট দিলেও তা নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আটকে রেখেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
এ.আই.এল/সকালবেলা