বগুড়ায় আদালত বর্জন অব্যাহত, ভোগান্তিতে বিচারপ্রার্থীরা
ওয়াফিক শিপলু, বগুড়া প্রতিনিধি: বগুড়ায় নতুন জেলা ও দায়রা জজ পদায়নকে কেন্দ্র করে আইনজীবীদের একাংশের টানা আন্দোলনে বিচারিক কার্যক্রমে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। গত বুধবার থেকে শুরু হওয়া এ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আজ মঙ্গলবারও এজলাসে হট্টগোলের মুখে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেননি নবনিযুক্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মনিরুজ্জামান।
এজলাসে বসার মাত্র সাত মিনিটের মাথায় আন্দোলনকারী আইনজীবীদের স্লোগান ও হট্টগোলের কারণে এজলাস ছেড়ে খাসকামরায় চলে যান তিনি। আদালত সংশ্লিষ্টদের মতে, বিচারকের পদায়ন নিয়ে আইনজীবীদের আপত্তি বা প্রতিবাদ জানানোর আইনগত ও সাংগঠনিক পথ থাকলেও আদালত বর্জন এবং এজলাসে হট্টগোলের কারণে সরাসরি বিচারিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় পেশাগত আচরণ ও আদালতের শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আইনজীবীদের পেশাগত আচরণবিধিতে আদালতের মর্যাদা ও বিচারিক কার্যক্রমের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার সকাল ১১টা ২৮ মিনিটে নবনিযুক্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মনিরুজ্জামান বিচারিক কার্যক্রম শুরু করতে এজলাসে আসন গ্রহণ করেন। তিনি বসার পরপরই আন্দোলনকারী এক পক্ষের আইনজীবীরা হট্টগোল শুরু করেন এবং বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। কোনো আইনজীবী মামলায় অংশ না নেওয়ায় পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মাত্র সাত মিনিট পর ১১টা ৩৫ মিনিটে বিচারক এজলাস ত্যাগ করে খাসকামরায় চলে যান। পরে ডিবি ও থানা পুলিশ আদালত এলাকায় গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এদিনও স্বাভাবিক বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি।
দীর্ঘদিন জেলা ও দায়রা জজের পদ শূন্য থাকার পর গত ১৭ সেপ্টেম্বর নতুন জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে মো. মনিরুজ্জামানকে পদায়ন করা হয়। তার পদায়নকে কেন্দ্র করে ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে আইনজীবীদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। এরপর থেকে আদালত বর্জনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন আন্দোলনকারী আইনজীবীরা।
আইনজীবীদের আদালত বর্জন নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, কোনো বিচারকের পদায়ন বা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি থাকলে তা নির্ধারিত আইনগত ও সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় উত্থাপন না করে বিচারিক কার্যক্রম বন্ধ রাখা কতটা গ্রহণযোগ্য। কারণ বিচারিক কার্যক্রমের মূল কেন্দ্রবিন্দু বিচারপ্রার্থী জনগণ। আদালতের কার্যক্রম বন্ধ থাকলে মামলার পক্ষগুলো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
এদিকে বারের সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার অভিযোগে অ্যাডভোকেট মো. আব্দুল ওহাবসহ চার আইনজীবীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বগুড়া জেলা অ্যাডভোকেট বার সমিতি। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অ্যাডভোকেট আব্দুল ওহাবের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং আইনজীবী হিসেবে সনদ পাওয়ার বিষয়ে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের একটি শোকজ নোটিশের ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে আদালত পাড়ায় নতুন করে আলোচনা ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. আব্দুল ওহাব বলেন, বিষয়টি পুরনো এবং মীমাংসিত। দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তিনি পিপলস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়মিত আইন পাস করে নিয়ম মেনেই সনদ ও লাইসেন্স পেয়েছেন। পুরনো বিষয় সামনে এনে তাকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট আবদুল বাছেদ বলেন, বার ও বেঞ্চের সমন্বয়ের মাধ্যমে স্বাভাবিক বিচার পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই তার মূল লক্ষ্য। দীর্ঘদিন জেলা জজের পদ শূন্য থাকার পর নিয়োগ হলেও পদায়নকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা বিচারপ্রার্থীরা বিচারসেবা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। দ্রুত সংকটের সমাধান প্রয়োজন।
এদিকে বগুড়া জেলা অ্যাডভোকেট বার সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, নতুন জেলা ও দায়রা জজের পদায়ন এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে সাধারণ সভা আহ্বান করা হয়েছে। সাধারণ সভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন ও বিচারিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের বিষয়ে তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে।
আদালত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতে, বার ও বেঞ্চের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে বগুড়ার বিচারিক অঙ্গনে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার শত শত বিচারপ্রার্থী আদালতে এসে কার্যক্রম না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এতে মামলার শুনানি ও নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিচারকের পদায়ন নিয়ে বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং বার-বেঞ্চের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা না হলে এই অচলাবস্থা আরো দীর্ঘায়িত হতে পারে। তাই বিচারপ্রার্থীদের স্বার্থে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত স্বাভাবিক বিচারিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ জরুরি।
এআইএল/সকালবেলা