কর্ণফুলী থানা চেকপোস্টে পুলিশের রাতদিন তল্লাশি
মোহাম্মদ সোহেল রানা, চট্টগ্রাম ব্যুরো চিফ: কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল প্রবেশদ্বার কর্ণফুলী থানার মইজ্যার টেক এলাকা। পর্যটন নগরী কক্সবাজার ও সীমান্ত এলাকা থেকে ছেড়ে আসা দূরপাল্লার স্লিপিং বাস, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস কিংবা নোহা—প্রতিটি যানবাহনেই দিনরাত চলছে কর্ণফুলী থানা পুলিশের নিবিড় ও সতর্ক তল্লাশি। মাদকমুক্ত সমাজ ও অপরাধমুক্ত দেশ গড়ার প্রত্যয়ে পুলিশ সদস্যরা এখানে টানা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
তল্লাশি জোরদারের সার্বিক বিষয়ে কর্ণফুলী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নূর মোহাম্মদ বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বাস্তবায়নে তারা কোনো ধরনের আপস করতে রাজি নন। তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে ব্যক্ত করেন, “মাদক আজ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। এককভাবে পুরো সমাজ থেকে মাদক রাতারাতি নির্মূল করা কঠিন হলেও, আমাদের থানা সীমানা ব্যবহার করে কেউ যেন নিরাপদে নগরীতে মাদকের চালান নিয়ে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য তল্লাশি ও অপরাধী শনাক্তকরণের গতি বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে।”
ওসি নূর মোহাম্মদের এহেন দৃঢ় নেতৃত্ব ও কঠোর মনোভাবের কারণেই পুরো কর্ণফুলী থানা পুলিশ মাদকবিরোধী অভিযানে আরও বেগবান হয়ে উঠেছে। তিনি শুধু নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত থাকেন না, প্রায় প্রতিদিন গভীর রাতে নিজে মইজ্যার টেক চেকপোস্টে উপস্থিত হয়ে সার্বিক তল্লাশি কার্যক্রম তদারকি করেন। ওসির এই মাঠপর্যায়ের উপস্থিতি কনস্টেবল থেকে শুরু করে সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) ও এএসআই স্তরের সকল পুলিশ সদস্যদের কাজের গতি ও মনোবল বহুলাংশে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
চেকপোস্টে দীর্ঘ সময় তল্লাশির কারণে সাধারণ যাত্রীদের কিছুটা সাময়িক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এতে অনেক সময় যাত্রীদের মধ্যে কিছুটা অসন্তোষ দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে ওসি বলেন, সব পুলিশ সদস্যকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন অত্যন্ত সুশীল আচরণের মাধ্যমে তল্লাশি ও অপরাধী শনাক্তকরণ কাজ চালানো হয় এবং অহেতুক যেন কোনো সাধারণ যাত্রী কিংবা পথচারী হয়রানির শিকার না হন।
চেকপোস্টে মূল কার্যাবলী সম্পাদন করেন ডিউটিতে থাকা সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই), এএসআই এবং কনস্টেবলরা। কাঠফাটা রোদ, মুষলধারে বৃষ্টি কিংবা কনকনে শীতের গভীর রাতে যখন পুরো নগরী ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে, তখনো এই পুলিশ সদস্যরা রাজপথে দাঁড়িয়ে পাহারাদারি চালান। জীবন বাজি রেখে রাতের আঁধারে সন্দেহভাজন গাড়ি থামানো, গাড়িগুলোর ইঞ্জিন, ব্যাকডালা ও যাত্রীদের মালামাল তল্লাশি করার কাজটি অত্যন্ত নিপুণভাবে সম্পাদন করছেন এসআই ও এএসআইরা। শত শারীরিক ক্লান্তি ও কষ্ট সহ্য করে দেশের ও সমাজের সুরক্ষায় তাদের এই নিরলস আত্মত্যাগ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।
প্রতিবেদকের সরজমিন পর্যবেক্ষণে চেকপোস্টের একটি বড় কৌশলগত সীমাবদ্ধতা উঠে এসেছে। বর্তমানে দূরপাল্লার বিভিন্ন যানবাহনে যাত্রী সেজে নারীরা তাদের দেহের স্পর্শকাতর স্থানে গোপনে ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক বহন করছে—এমন কৌশল প্রায়ই সামনে আসছে। কিন্তু মইজ্যার টেক চেকপোস্টে পর্যাপ্ত পুরুষ সদস্যের তুলনায় কোনো নারী পুলিশ সদস্যের উপস্থিতি না থাকায় নারী যাত্রীদের দেহ তল্লাশি করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি নূর মোহাম্মদ স্বীকার করেন যে, থানায় পর্যাপ্ত নারী পুলিশ সদস্য না থাকায় এই টেকনিক্যাল সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তবে বিষয়টি দ্রুত সমাধানের জন্য তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবেন বলে জানান।
কর্ণফুলী থানা পুলিশের কড়া নজরদারিতে গত কয়েক বছরে মহাসড়কে মাদকের একাধিক বড় চালান জব্দ করা সম্ভব হয়েছে: ২৫ মার্চ ২০২৫: মইজ্যার টেক চেকপোস্টে তল্লাশি চালিয়ে একটি মাইক্রোবাস জব্দসহ ৬ হাজার পিস ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করে কর্ণফুলী থানা পুলিশ। ২৪ মে ২০২৬: মহাসড়কের পাশে অস্থায়ী চেকপোস্ট বসিয়ে অভিযান চালিয়ে প্রাইভেটকার তল্লাশি করে প্রায় ৫০ হাজার পিস ইয়াবাসহ আন্তর্জাতিক ও আন্তঃজেলা চক্রের ৩ জন মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২২ মে ২০২৬: কর্ণফুলী থানা পুলিশ শাহ মোহছেন আউলিয়া এলাকায় একটি কাভার্ডভ্যানের গোপন চেম্বারে লুকিয়ে রাখা ৭১ লাখ টাকা মূল্যের বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ চালককে আটক করতে সক্ষম হয়। এ ছাড়া ইতিপূর্বেও ক্রিমের টিউবের ভেতরে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা ৪,৩০০ পিস ইয়াবাসহ পাচারকারীকে হাতেনাতে আটক করে আদালতে সোপর্দ করেছিল কর্ণফুলী থানা পুলিশ।
চট্টগ্রাম নগরীকে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করতে মইজ্যার টেক চেকপোস্টের ভূমিকা ঢাল স্বরূপ। একের পর এক বড় বড় চালান ভেস্তে দিয়ে ওসি নূর মোহাম্মদের নেতৃত্বে কর্ণফুলী থানা পুলিশ প্রমাণ করেছে যে অপরাধী ও মাদক কারবারিদের জন্য এই মহাসড়কে কোনো ছাড় নেই।
স্থানীয়দের মতে, এই চেকপোস্টে যদি দ্রুত পর্যাপ্ত নারী পুলিশ সদস্য পদায়ন করা হয় এবং প্রযুক্তিনির্ভর (যেমন: স্ক্যানার ও ডগ স্কোয়াড) তল্লাশির ব্যবস্থা করা হয়, তবে মাদক নির্মূল অভিযান আরও কয়েক গুণ শক্তিশালী হবে। ওসি নূর মোহাম্মদের দিকনির্দেশনা ও মাঠপর্যায়ের এসআই, এএসআই সহ প্রতিটা পুলিশ সদস্যের এই ত্যাগের ধারাবাহিকতায় কর্ণফুলী থানা এলাকাকে সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত করতে তারা ভবিষ্যতে আরও কঠোর ও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করবেন—এমনটাই প্রত্যাশা চট্টগ্রামবাসীর।
এআইএল/সকালবেলা