জামালপুর আশেক মাহমুদ কলেজে সেশন ফির নামে ৬৭ লাখ টাকা বাড়তি আদায়ের অভিযোগ
মো. ইমরান মাহমুদ, জামালপুর প্রতিনিধি: জামালপুর সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সেশন চার্জের নামে বিভিন্ন খাতে অনিয়ম করে বছরে প্রায় ৬৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
সরকারি পরিপত্র উপেক্ষা করে পরিবহন, আইসিটি, চিকিৎসা, অতিথি শিক্ষক, উন্নয়ন তহবিল, পরিচয়পত্র, ব্যবস্থাপনা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি, রোভার স্কাউট, বিএনসিসি এবং নিরাপত্তা ও কর্মচারী খাতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এসব অর্থ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। এ নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিলের ৩৭.০০.০০০০.১৫১.০৯.০০৩.২৩.১২৩ নম্বর স্মারকে ‘সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিকট হতে আদায়কৃত অর্থের আয়-ব্যয় সংক্রান্ত সংশোধিত নীতিমালা’ প্রণয়ন করা হয়। ওই পরিপত্রের তফসিল ‘খ’ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কলেজটিতে অনুমোদন না থাকা কয়েকটি খাতে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অনুমোদিত কিছু খাতেও একাধিকবার টাকা নেওয়া হচ্ছে।
কলেজের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে প্রথম বর্ষ সম্মান শ্রেণিতে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করেছেন ২ হাজার ১৪৮ জন শিক্ষার্থী। এরমধ্যে কলা ও বাণিজ্য বিভাগের ১ হাজার ৪৬৩ জন এবং বিজ্ঞান বিভাগের ৬৮৫ জন। সম্মান, ডিগ্রি, মাস্টার্স ও প্রিলিমিনারি টু মাস্টার্স মিলিয়ে এইচএসসি বাদে কলেজটিতে শিক্ষার্থী রয়েছেন প্রায় ১১ হাজার ২২২ জন।
অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে পরিবহন ফি নিয়ে। পরিপত্র অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবহন ব্যবস্থা থাকলেই কেবল এ খাতে অর্থ আদায় করা যাবে। কিন্তু কলেজে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব কোনো পরিবহন ব্যবস্থা না থাকার পরও তাদের কাছ থেকে ২০০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে বছরে প্রায় ২২ লাখ ৪৪ হাজার ৪০০ টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হচ্ছে।
আইসিটি ফি নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। সরকারি পরিপত্রে ‘আইসিটি ফি’ নামে কোনো অনুমোদিত খাত না থাকলেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১২০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। বিভিন্ন বর্ষ ও কোর্স মিলিয়ে এ খাতে বছরে প্রায় ১৩ লাখ ৪৬ হাজার ৬৪০ টাকা আদায় করা হচ্ছে।
চিকিৎসা ফি আদায় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পরিপত্র অনুযায়ী, যেসব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাসেবা রয়েছে, কেবল সেসব প্রতিষ্ঠানেই এ খাতে অর্থ আদায় করা যাবে। কিন্তু কলেজে চিকিৎসাসেবা না থাকার পরও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এ বাবদ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এতে বছরে প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার ৪৪০ টাকা আদায় করা হচ্ছে।
অতিথি শিক্ষক ফি নামেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১৫০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে, যা পরিপত্রে উল্লেখ নেই। শুধু প্রথম বর্ষ সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই এ খাতে প্রায় ৩ লাখ ২২ হাজার ২০০ টাকা নেওয়া হয়েছে।
উন্নয়ন তহবিলের অর্থ কেবল প্রথম বর্ষে এককালীন আদায়ের কথা থাকলেও প্রত্যেক বর্ষে ১০০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। এতে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৭ লাখ ৩৪ হাজার ৪০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। পরিচয়পত্রের ফি প্রথম বর্ষে একবার নেওয়ার কথা থাকলেও দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষেও আদায় করা হচ্ছে, যা বছরে দাঁড়ায় প্রায় ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৭০০ টাকা।
ব্যবস্থাপনা ফি নির্ধারিত ৫০ টাকার পরিবর্তে ১০০ টাকা করে আদায় করায় বছরে বাড়তি প্রায় ৫ লাখ ৬১ হাজার ১০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। ক্রীড়া ও সংস্কৃতি, রোভার স্কাউট ও বিএনসিসি খাতেও একই অর্থ দুইবার আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় অভিযোগ নিরাপত্তা ও কর্মচারী খাত নিয়ে। এ খাতে সেশন ফির সঙ্গে প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রায় ১ হাজার ১০০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। কলেজের প্রায় ১১ হাজার ২২২ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে এ বাবদ বছরে প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ ৪৪ হাজার ২০০ টাকা আদায় হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কলেজটিতে প্রায় ৭৯ জন কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে নয়জনের বেতন সরকারি বরাদ্দ থেকে দেওয়া হয়। বাকি প্রায় ৭০ জনের বেতন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ থেকে দেওয়া হয়। কর্মচারীদের বেতন-বোনাস হিসাব করলে বছরে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা। সে হিসাবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এ খাতে বছরে প্রায় ৫ লাখ ৮৪ হাজার ২০০ টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হচ্ছে। পরিপত্রে অনিয়মিত শ্রমিকের সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে বলা হলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ তা অনুসরণ করেনি বলে অভিযোগ।
কয়েকজন অভিভাবক আক্ষেপ করে বলেন, "একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানুষ গড়ার জায়গা। সেখানকার কারিগররা যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হন, তাহলে আমাদের সন্তানরা কী শিখবে?" সব মিলিয়ে বিভিন্ন খাতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বছরে প্রায় ৬৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হলেও বাড়তি টাকা কোন কোন খাতে ব্যয় করা হচ্ছে, সে বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করতে পারেনি।
এ নিয়ে জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, "যেসব সুবিধার কথা বলে অর্থ আদায় করা হচ্ছে, এসবই দুর্নীতি। দ্রুত কলেজ থেকে এসব দুর্নীতি বন্ধের দাবি জানাই।"
এ বিষয়ে সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. শওকত আলম মীর বলেন, "মাস্টাররোল কর্মচারী বা ফি আদায়ে সরকারের যে নীতিমালা বা পরিপত্র আছে, কোনো সরকারি কলেজই তার বাইরে যেতে পারে না। আমরাও সেই পরিপত্রের বাইরে অবস্থান করছি না। আর সম্প্রতি নতুন কোনো কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়নি।"
|