বিএডিসি প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের দ্বন্দ্ব, নেপথ্যে ৫০ লাখ টাকার অভিযোগ
প্রকাশ: শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৭ অপরাহ্ণ
অনক আলী হোসেন শাহিদীঃ বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) চট্টগ্রাম অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলামকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁর দপ্তরে প্রবেশ, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগে চট্টগ্রামের বিশিষ্ট আবাসন ব্যবসায়ী ও ঠিকাদার মোহাম্মদ আলমগীর, তাঁর সহযোগী মো. মনির হোসেন এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৬-৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাস। তবে মামলাটির নেপথ্যে পাঁচ কোটি টাকার উন্নয়নকাজের ঠিকাদারি কার্যাদেশের বিপরীতে কথিত ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ সামনে আসায় ঘটনাটি নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
মামলার বাদী সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাসের বক্তব্য, তিনি ব্যক্তিগতভাবে এ ধরনের মামলা দায়ের করতে চাননি; তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলামের চাপের মুখে মামলাটি দায়ের করেছেন। অন্যদিকে, মামলার আসামি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলমগীরের দাবি, কথিত ৫০ লাখ টাকা প্রদানের পরও প্রতিশ্রুত কার্যাদেশ না পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর তাঁকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে এ মামলা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো বারবার অস্বীকার করে আসছেন। এর মধ্যে মামলার এজাহারে ঘটনাস্থল পাঁচলাইশ থানাধীন উল্লেখ করা হলেও মামলা দায়ের করা হয়েছে চান্দগাঁও থানায়। এ নিয়েও নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কেন ঘটনাস্থলের থানায় মামলা না করে অন্য থানায় মামলা করা হলো, পাঁচলাইশ থানার ভূমিকা কী ছিল এবং এ বিষয়ে কোনো প্রশাসনিক বা এখতিয়ারগত ব্যাখ্যা রয়েছে কি না—তা নিয়েও অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের চান্দগাঁও থানায় দায়ের করা মামলার নম্বর ০৯। মামলাটি দায়ের করা হয় ৬ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে। এজাহারে ঘটনার তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ৪ জানুয়ারি ২০২৬। দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ১৪৩/৪৪৭/৪৪৮/৩২৩/৫০৬ ধারায় মামলাটি রুজু করা হয়।
মামলার বাদী বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাস। তিনি চট্টগ্রামের আবাসন ব্যবসায়ী ও ঠিকাদার মোহাম্মদ আলমগীর, তাঁর সহযোগী মো. মনির হোসেন এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৬-৭ জনকে আসামি করে মামলাটি দায়ের করেন।
এজাহারের অভিযোগ অনুযায়ী, আসামিরা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলামকে হত্যার উদ্দেশ্যে প্রকৌশলী দপ্তরের উঁচু দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হত্যার হুমকি দেন।
তবে দেয়াল টপকে প্রবেশের অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নথি কিংবা অন্যান্য দালিলিক প্রমাণ রয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
মামলাটি তদন্ত করছেন চান্দগাঁও থানার উপপরিদর্শক মোহাম্মদ ফয়সল।
মামলার এজাহারে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার স্থান হিসেবে পাঁচলাইশ থানাধীন বিএডিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দপ্তরের ঠিকানা, ১৬ নম্বর ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ মামলাটি দায়ের করা হয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের চান্দগাঁও থানায়। এখানেই মামলার প্রক্রিয়া নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে।
সাধারণভাবে যে এলাকায় অপরাধ সংঘটিত হয়, সেই এলাকার পুলিশি এখতিয়ার ও তদন্তের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়। ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১৫৬(১) ধারায় থানার স্থানীয় এখতিয়ার অনুযায়ী আমলযোগ্য অপরাধ তদন্তের বিধান রয়েছে। একই আইনের ১৭৭ ধারায় অপরাধ সংঘটিত হওয়ার এলাকার আদালতে সাধারণত বিচার ও অনুসন্ধানের কথা বলা হয়েছে। তবে অপরাধের স্থান অনিশ্চিত হওয়া, একাধিক এলাকায় সংঘটিত হওয়া কিংবা ধারাবাহিক অপরাধের মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে ১৮২ ধারায় একাধিক এলাকার এখতিয়ার প্রযোজ্য হতে পারে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, এজাহারে ঘটনাস্থল পাঁচলাইশ থানাধীন উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও কেন চান্দগাঁও থানায় মামলা দায়ের করা হলো? পাঁচলাইশ থানায় প্রথমে কোনো অভিযোগ বা তথ্য দেওয়া হয়েছিল কি না? অভিযোগটি কি কোনো কারণে চান্দগাঁও থানায় পাঠানো হয়েছিল? নাকি ঘটনার সঙ্গে অন্য কোনো এলাকার এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট ছিল?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, ঘটনার সময় পাঁচলাইশ থানার কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল কি না এবং সেখানে মামলা গ্রহণে কোনো প্রশাসনিক বা আইনগত প্রতিবন্ধকতা ছিল কি না। তবে এ বিষয়ে কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়া পাঁচলাইশ থানা নিষ্ক্রিয় ছিল বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
সংশ্লিষ্ট দুই থানার রেকর্ড, অভিযোগ গ্রহণের তথ্য, মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া এবং তদন্তের এখতিয়ারসংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে। মামলার বাদী তমাল দাস, সংশ্লিষ্ট থানা কর্তৃপক্ষ এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা নেওয়া প্রয়োজন।
মামলার অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের পাশাপাশি মামলা দায়েরের স্থান ও প্রক্রিয়াগত বৈধতার বিষয়টিও স্বচ্ছভাবে যাচাই করা জরুরি।
মামলাটির নেপথ্যের ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রামের হাসিমপুর এলাকার আবাসন ব্যবসায়ী ও ঠিকাদার মোহাম্মদ আলমগীরের সঙ্গে বিএডিসির চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলামের ব্যবসায়িক যোগাযোগ গড়ে ওঠে।
মোহাম্মদ আলমগীরের দাবি, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার উন্নয়নকাজের ঠিকাদারি কার্যাদেশ পাওয়ার প্রত্যাশায় তিনি তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক মো. নুরুল ইসলামকে তিন কিস্তিতে মোট ৫০ লাখ টাকা প্রদান করেন।
তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, প্রথম কিস্তিতে একজন ঠিকাদারের মাধ্যমে পাঁচ লাখ টাকা, পরবর্তী সময়ে সরাসরি ৩৫ লাখ টাকা এবং সর্বশেষ আরও ১০ লাখ টাকা প্রদান করা হয়। অর্থাৎ তিন দফায় মোট ৫০ লাখ টাকা দেওয়ার দাবি করেছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, টাকা প্রদানের সময় দুজন ঠিকাদার উপস্থিত ছিলেন।
আলমগীরের অভিযোগ, কথিত অর্থ প্রদানের পরও নির্ধারিত সময়ে কোনো কার্যাদেশ না পাওয়ায় তিনি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর কাছে বিষয়টি জানতে চান। তাঁর দাবি, এ নিয়ে অসন্তোষ ও বিরোধের সৃষ্টি হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে হত্যার উদ্দেশ্যে দপ্তরে প্রবেশ ও হত্যার হুমকির অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়।
তবে ৫০ লাখ টাকা প্রদানের অভিযোগ, অর্থের উৎস, গ্রহণকারী ব্যক্তি এবং কথিত কার্যাদেশের সঙ্গে এর সম্পর্ক এখনো স্বাধীনভাবে প্রমাণিত নয়। এ বিষয়ে উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্য, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ এবং প্রকল্পের দরপত্র ও কার্যাদেশসংক্রান্ত নথিপত্র পরীক্ষা করা জরুরি।
মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বাদী সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাসের বক্তব্য। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপকালে তিনি দাবি করেন, এ ধরনের মামলা দায়ের করার বিষয়ে তাঁর ব্যক্তিগত আগ্রহ ছিল না। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলামের চাপের মুখে তিনি মামলাটি দায়ের করেছেন বলে জানান।
একজন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হিসেবে মামলার বাদী যদি সত্যিই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার চাপের মুখে মামলা দায়ের করে থাকেন, তাহলে সেই চাপের প্রকৃতি, প্রেক্ষাপট এবং ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন।
তাঁর এই বক্তব্য মামলার এজাহারের অভিযোগের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাদীর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই এবং কেন তিনি এমন অভিযোগ করেছেন, তা নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
মামলার নেপথ্যের আর্থিক অভিযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী সূত্র হিসেবে সামনে এসেছে চট্টগ্রাম শহরের দুটি ব্যাংক শাখা। অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম তাঁর দুই থেকে তিনজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে কথিত অর্থ লেনদেন ও জমার ব্যবস্থা করতেন।
অভিযোগে চট্টগ্রামের এনসিসি ব্যাংকের কামাল বাজার শাখা এবং ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মুরাদপুর শাখার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আরও অভিযোগ রয়েছে, তিনি মাঝেমধ্যে নিজে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখায় উপস্থিত থাকতেন এবং তাঁর একান্ত সহকারীদের মাধ্যমে ঠিকাদারদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করতেন।
এ বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী পদক্ষেপ হতে পারে সংশ্লিষ্ট দুই ব্যাংকের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা। নির্দিষ্ট অভিযোগের সময়কাল, সংশ্লিষ্ট তারিখ এবং ব্যাংকিং লেনদেনের সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম কিংবা তাঁর একান্ত সহকারীদের ব্যাংকে উপস্থিতির কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে যেসব তারিখে কথিত অর্থ জমা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, সেসব তারিখের ব্যাংকিং লেনদেনের সময়ের সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ মিলিয়ে দেখলে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
শুধু ব্যাংকে উপস্থিতি ঘুষ গ্রহণের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। এ জন্য সংশ্লিষ্ট হিসাবের জমা স্লিপ, অর্থ জমাদানকারীর পরিচয়, লেনদেনের পরিমাণ, হিসাবধারীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পর্ক এবং ব্যাংকের সংরক্ষিত নথিপত্রও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ব্যাংকের সিসিটিভি ফুটেজ নির্দিষ্ট সময় পর মুছে ফেলা বা সংরক্ষণসীমা শেষ হওয়ার ঝুঁকি থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত আইনগত প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় ফুটেজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি ব্যাংকের কাছে থাকা সংশ্লিষ্ট হিসাবের লেনদেন বিবরণী, জমা স্লিপ ও অন্যান্য রেকর্ড সংগ্রহ করা প্রয়োজন।
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব অভিযোগ বারবার অস্বীকার করে আসছেন। কথিত ৫০ লাখ টাকা গ্রহণ, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে অর্থ জমা এবং মামলার বাদীকে চাপ প্রয়োগের অভিযোগের বিষয়ে তিনি অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা কিংবা তাঁর বক্তব্যের যথার্থতা নির্ধারণে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন বা বিচারিক সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর বক্তব্যসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের তথ্য, ব্যাংকিং নথি, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বিএডিসির নিজস্ব তদন্ত কর্তৃপক্ষের সমন্বিত অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে।
বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলামের চাকরিজীবনের শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত তাঁর নিজস্ব ব্যাংক হিসাব, পরিবারের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের উৎস আইনগতভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
তাঁর আয় ও বৈধ সম্পদের সঙ্গে ব্যাংকিং লেনদেনের সামঞ্জস্য, অস্বাভাবিক অর্থ জমা, নগদ লেনদেন এবং কথিত ঠিকাদারি অর্থের প্রবাহ অনুসন্ধান করা হলে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের সুযোগ তৈরি হবে।
একই সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহকারীদের ভূমিকা, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের আর্থিক লেনদেন এবং প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে কোনো অস্বাভাবিক আর্থিক সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এ ধরনের অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগত অনুমোদন ও প্রচলিত মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনসহ প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুসরণ করে পরিচালনা করতে হবে।
বিএডিসির চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পটি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে ঠিকাদারি কার্যাদেশ প্রদান, দরপত্র মূল্যায়ন, বিল পরিশোধ এবং প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
তাই কথিত পাঁচ কোটি টাকার উন্নয়নকাজের দরপত্র, কার্যাদেশ প্রদান, ঠিকাদার নির্বাচন, অনুমোদিত ব্যয়, প্রকল্পের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কে কোন কাজের জন্য দরপত্রে অংশ নিয়েছেন, কার্যাদেশ কাকে দেওয়া হয়েছে, কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয়েছে কি না—এসব বিষয় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত।
বিশেষ করে কথিত ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগের সঙ্গে প্রকল্পের কোনো কার্যাদেশ বা আর্থিক সিদ্ধান্তের সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করা জরুরি।
মামলার আসামি মোহাম্মদ আলমগীর আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন বলে জানা গেছে। জামিনের পর মামলার বাদীপক্ষের সঙ্গে তাঁর বিষয়টি সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।
কিন্তু অভিযোগটি যদি সত্যিই একজন সরকারি কর্মকর্তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা ও হত্যার হুমকির মতো গুরুতর অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়, তাহলে ব্যক্তিগত সমঝোতার মাধ্যমে এর নিষ্পত্তি কতটা আইনসম্মত ও গ্রহণযোগ্য, সে প্রশ্ন রয়েছে। আবার অভিযোগটি যদি ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে সাজানো হয়ে থাকে, তাহলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন।
কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে মিথ্যা মামলায় হয়রানি করা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি সরকারি কর্মকর্তার ওপর হামলা বা হত্যার হুমকির অভিযোগও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চান্দগাঁও থানার উপপরিদর্শক মোহাম্মদ ফয়সলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সরকারের প্রচলিত বিধিবিধান ও আইন অনুসরণ করে নিরপেক্ষভাবে মামলাটি তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তের ফলাফল নির্ধারিত সময়ে সংশ্লিষ্ট আদালতে দাখিল করা হবে বলেও তিনি জানান।
একদিকে একজন সরকারি প্রকৌশলীকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ, অন্যদিকে মামলার বাদীর নিজের বক্তব্যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার চাপের বিষয়টি উঠে আসা এবং ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ—সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন কেবল একটি থানার মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহার এবং সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহির প্রশ্নও জড়িত।
বিশেষ করে পাঁচলাইশ থানার পরিবর্তে চান্দগাঁও থানায় মামলা দায়েরের কারণ, সংশ্লিষ্ট দুই ব্যাংকের সিসিটিভি ফুটেজ, ব্যাংক হিসাবের লেনদেন বিবরণী, জমা স্লিপ এবং প্রকল্পের ঠিকাদারি নথিপত্র একসঙ্গে পরীক্ষা করা হলে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সম্ভব।
প্রশ্ন হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে কি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁর দপ্তরে হামলার ঘটনা ঘটেছিল, নাকি কথিত ৫০ লাখ টাকা লেনদেন ও ঠিকাদারি কার্যাদেশসংক্রান্ত বিরোধ থেকেই মামলার সূত্রপাত? মামলার বাদী কেন বলেছেন যে তিনি নিজে মামলা করতে চাননি? এজাহারে ঘটনাস্থল পাঁচলাইশ থানাধীন উল্লেখ থাকার পরও চান্দগাঁও থানায় মামলা দায়েরের কারণ কী? পাঁচলাইশ থানার ভূমিকা কী ছিল? সংশ্লিষ্ট দুই ব্যাংকের সিসিটিভি ফুটেজে কি কথিত অর্থ জমার সময় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর উপস্থিতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যাবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর একমাত্র নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি, মামলার প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের পাশাপাশি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া, বিএডিসির প্রকল্পের ঠিকাদারি কার্যক্রম, কথিত আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের আইনসম্মত অনুসন্ধান নিশ্চিত করা হোক।
সরকারি দায়িত্ব ও ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা মিথ্যা মামলা—কোনোটিই যেন পার পেয়ে না যায়। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন।
মামলার বাদী সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাসের বক্তব্য, তিনি ব্যক্তিগতভাবে এ ধরনের মামলা দায়ের করতে চাননি; তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলামের চাপের মুখে মামলাটি দায়ের করেছেন। অন্যদিকে, মামলার আসামি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলমগীরের দাবি, কথিত ৫০ লাখ টাকা প্রদানের পরও প্রতিশ্রুত কার্যাদেশ না পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর তাঁকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে এ মামলা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো বারবার অস্বীকার করে আসছেন। এর মধ্যে মামলার এজাহারে ঘটনাস্থল পাঁচলাইশ থানাধীন উল্লেখ করা হলেও মামলা দায়ের করা হয়েছে চান্দগাঁও থানায়। এ নিয়েও নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কেন ঘটনাস্থলের থানায় মামলা না করে অন্য থানায় মামলা করা হলো, পাঁচলাইশ থানার ভূমিকা কী ছিল এবং এ বিষয়ে কোনো প্রশাসনিক বা এখতিয়ারগত ব্যাখ্যা রয়েছে কি না—তা নিয়েও অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের চান্দগাঁও থানায় দায়ের করা মামলার নম্বর ০৯। মামলাটি দায়ের করা হয় ৬ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে। এজাহারে ঘটনার তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ৪ জানুয়ারি ২০২৬। দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ১৪৩/৪৪৭/৪৪৮/৩২৩/৫০৬ ধারায় মামলাটি রুজু করা হয়।
মামলার বাদী বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাস। তিনি চট্টগ্রামের আবাসন ব্যবসায়ী ও ঠিকাদার মোহাম্মদ আলমগীর, তাঁর সহযোগী মো. মনির হোসেন এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৬-৭ জনকে আসামি করে মামলাটি দায়ের করেন।
এজাহারের অভিযোগ অনুযায়ী, আসামিরা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলামকে হত্যার উদ্দেশ্যে প্রকৌশলী দপ্তরের উঁচু দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হত্যার হুমকি দেন।
তবে দেয়াল টপকে প্রবেশের অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নথি কিংবা অন্যান্য দালিলিক প্রমাণ রয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
মামলাটি তদন্ত করছেন চান্দগাঁও থানার উপপরিদর্শক মোহাম্মদ ফয়সল।
মামলার এজাহারে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার স্থান হিসেবে পাঁচলাইশ থানাধীন বিএডিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দপ্তরের ঠিকানা, ১৬ নম্বর ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ মামলাটি দায়ের করা হয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের চান্দগাঁও থানায়। এখানেই মামলার প্রক্রিয়া নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে।
সাধারণভাবে যে এলাকায় অপরাধ সংঘটিত হয়, সেই এলাকার পুলিশি এখতিয়ার ও তদন্তের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়। ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১৫৬(১) ধারায় থানার স্থানীয় এখতিয়ার অনুযায়ী আমলযোগ্য অপরাধ তদন্তের বিধান রয়েছে। একই আইনের ১৭৭ ধারায় অপরাধ সংঘটিত হওয়ার এলাকার আদালতে সাধারণত বিচার ও অনুসন্ধানের কথা বলা হয়েছে। তবে অপরাধের স্থান অনিশ্চিত হওয়া, একাধিক এলাকায় সংঘটিত হওয়া কিংবা ধারাবাহিক অপরাধের মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে ১৮২ ধারায় একাধিক এলাকার এখতিয়ার প্রযোজ্য হতে পারে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, এজাহারে ঘটনাস্থল পাঁচলাইশ থানাধীন উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও কেন চান্দগাঁও থানায় মামলা দায়ের করা হলো? পাঁচলাইশ থানায় প্রথমে কোনো অভিযোগ বা তথ্য দেওয়া হয়েছিল কি না? অভিযোগটি কি কোনো কারণে চান্দগাঁও থানায় পাঠানো হয়েছিল? নাকি ঘটনার সঙ্গে অন্য কোনো এলাকার এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট ছিল?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, ঘটনার সময় পাঁচলাইশ থানার কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল কি না এবং সেখানে মামলা গ্রহণে কোনো প্রশাসনিক বা আইনগত প্রতিবন্ধকতা ছিল কি না। তবে এ বিষয়ে কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়া পাঁচলাইশ থানা নিষ্ক্রিয় ছিল বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
সংশ্লিষ্ট দুই থানার রেকর্ড, অভিযোগ গ্রহণের তথ্য, মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া এবং তদন্তের এখতিয়ারসংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে। মামলার বাদী তমাল দাস, সংশ্লিষ্ট থানা কর্তৃপক্ষ এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা নেওয়া প্রয়োজন।
মামলার অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের পাশাপাশি মামলা দায়েরের স্থান ও প্রক্রিয়াগত বৈধতার বিষয়টিও স্বচ্ছভাবে যাচাই করা জরুরি।
মামলাটির নেপথ্যের ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রামের হাসিমপুর এলাকার আবাসন ব্যবসায়ী ও ঠিকাদার মোহাম্মদ আলমগীরের সঙ্গে বিএডিসির চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলামের ব্যবসায়িক যোগাযোগ গড়ে ওঠে।
মোহাম্মদ আলমগীরের দাবি, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার উন্নয়নকাজের ঠিকাদারি কার্যাদেশ পাওয়ার প্রত্যাশায় তিনি তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক মো. নুরুল ইসলামকে তিন কিস্তিতে মোট ৫০ লাখ টাকা প্রদান করেন।
তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, প্রথম কিস্তিতে একজন ঠিকাদারের মাধ্যমে পাঁচ লাখ টাকা, পরবর্তী সময়ে সরাসরি ৩৫ লাখ টাকা এবং সর্বশেষ আরও ১০ লাখ টাকা প্রদান করা হয়। অর্থাৎ তিন দফায় মোট ৫০ লাখ টাকা দেওয়ার দাবি করেছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, টাকা প্রদানের সময় দুজন ঠিকাদার উপস্থিত ছিলেন।
আলমগীরের অভিযোগ, কথিত অর্থ প্রদানের পরও নির্ধারিত সময়ে কোনো কার্যাদেশ না পাওয়ায় তিনি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর কাছে বিষয়টি জানতে চান। তাঁর দাবি, এ নিয়ে অসন্তোষ ও বিরোধের সৃষ্টি হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে হত্যার উদ্দেশ্যে দপ্তরে প্রবেশ ও হত্যার হুমকির অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়।
তবে ৫০ লাখ টাকা প্রদানের অভিযোগ, অর্থের উৎস, গ্রহণকারী ব্যক্তি এবং কথিত কার্যাদেশের সঙ্গে এর সম্পর্ক এখনো স্বাধীনভাবে প্রমাণিত নয়। এ বিষয়ে উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্য, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ এবং প্রকল্পের দরপত্র ও কার্যাদেশসংক্রান্ত নথিপত্র পরীক্ষা করা জরুরি।
মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বাদী সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাসের বক্তব্য। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপকালে তিনি দাবি করেন, এ ধরনের মামলা দায়ের করার বিষয়ে তাঁর ব্যক্তিগত আগ্রহ ছিল না। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলামের চাপের মুখে তিনি মামলাটি দায়ের করেছেন বলে জানান।
একজন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হিসেবে মামলার বাদী যদি সত্যিই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার চাপের মুখে মামলা দায়ের করে থাকেন, তাহলে সেই চাপের প্রকৃতি, প্রেক্ষাপট এবং ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন।
তাঁর এই বক্তব্য মামলার এজাহারের অভিযোগের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাদীর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই এবং কেন তিনি এমন অভিযোগ করেছেন, তা নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
মামলার নেপথ্যের আর্থিক অভিযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী সূত্র হিসেবে সামনে এসেছে চট্টগ্রাম শহরের দুটি ব্যাংক শাখা। অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম তাঁর দুই থেকে তিনজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে কথিত অর্থ লেনদেন ও জমার ব্যবস্থা করতেন।
অভিযোগে চট্টগ্রামের এনসিসি ব্যাংকের কামাল বাজার শাখা এবং ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মুরাদপুর শাখার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আরও অভিযোগ রয়েছে, তিনি মাঝেমধ্যে নিজে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখায় উপস্থিত থাকতেন এবং তাঁর একান্ত সহকারীদের মাধ্যমে ঠিকাদারদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করতেন।
এ বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী পদক্ষেপ হতে পারে সংশ্লিষ্ট দুই ব্যাংকের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা। নির্দিষ্ট অভিযোগের সময়কাল, সংশ্লিষ্ট তারিখ এবং ব্যাংকিং লেনদেনের সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম কিংবা তাঁর একান্ত সহকারীদের ব্যাংকে উপস্থিতির কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে যেসব তারিখে কথিত অর্থ জমা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, সেসব তারিখের ব্যাংকিং লেনদেনের সময়ের সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ মিলিয়ে দেখলে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
শুধু ব্যাংকে উপস্থিতি ঘুষ গ্রহণের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। এ জন্য সংশ্লিষ্ট হিসাবের জমা স্লিপ, অর্থ জমাদানকারীর পরিচয়, লেনদেনের পরিমাণ, হিসাবধারীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পর্ক এবং ব্যাংকের সংরক্ষিত নথিপত্রও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ব্যাংকের সিসিটিভি ফুটেজ নির্দিষ্ট সময় পর মুছে ফেলা বা সংরক্ষণসীমা শেষ হওয়ার ঝুঁকি থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত আইনগত প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় ফুটেজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি ব্যাংকের কাছে থাকা সংশ্লিষ্ট হিসাবের লেনদেন বিবরণী, জমা স্লিপ ও অন্যান্য রেকর্ড সংগ্রহ করা প্রয়োজন।
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব অভিযোগ বারবার অস্বীকার করে আসছেন। কথিত ৫০ লাখ টাকা গ্রহণ, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে অর্থ জমা এবং মামলার বাদীকে চাপ প্রয়োগের অভিযোগের বিষয়ে তিনি অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা কিংবা তাঁর বক্তব্যের যথার্থতা নির্ধারণে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন বা বিচারিক সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর বক্তব্যসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের তথ্য, ব্যাংকিং নথি, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বিএডিসির নিজস্ব তদন্ত কর্তৃপক্ষের সমন্বিত অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে।
বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলামের চাকরিজীবনের শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত তাঁর নিজস্ব ব্যাংক হিসাব, পরিবারের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের উৎস আইনগতভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
তাঁর আয় ও বৈধ সম্পদের সঙ্গে ব্যাংকিং লেনদেনের সামঞ্জস্য, অস্বাভাবিক অর্থ জমা, নগদ লেনদেন এবং কথিত ঠিকাদারি অর্থের প্রবাহ অনুসন্ধান করা হলে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের সুযোগ তৈরি হবে।
একই সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহকারীদের ভূমিকা, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের আর্থিক লেনদেন এবং প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে কোনো অস্বাভাবিক আর্থিক সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এ ধরনের অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগত অনুমোদন ও প্রচলিত মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনসহ প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুসরণ করে পরিচালনা করতে হবে।
বিএডিসির চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পটি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে ঠিকাদারি কার্যাদেশ প্রদান, দরপত্র মূল্যায়ন, বিল পরিশোধ এবং প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
তাই কথিত পাঁচ কোটি টাকার উন্নয়নকাজের দরপত্র, কার্যাদেশ প্রদান, ঠিকাদার নির্বাচন, অনুমোদিত ব্যয়, প্রকল্পের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কে কোন কাজের জন্য দরপত্রে অংশ নিয়েছেন, কার্যাদেশ কাকে দেওয়া হয়েছে, কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয়েছে কি না—এসব বিষয় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত।
বিশেষ করে কথিত ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগের সঙ্গে প্রকল্পের কোনো কার্যাদেশ বা আর্থিক সিদ্ধান্তের সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করা জরুরি।
মামলার আসামি মোহাম্মদ আলমগীর আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন বলে জানা গেছে। জামিনের পর মামলার বাদীপক্ষের সঙ্গে তাঁর বিষয়টি সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।
কিন্তু অভিযোগটি যদি সত্যিই একজন সরকারি কর্মকর্তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা ও হত্যার হুমকির মতো গুরুতর অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়, তাহলে ব্যক্তিগত সমঝোতার মাধ্যমে এর নিষ্পত্তি কতটা আইনসম্মত ও গ্রহণযোগ্য, সে প্রশ্ন রয়েছে। আবার অভিযোগটি যদি ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে সাজানো হয়ে থাকে, তাহলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন।
কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে মিথ্যা মামলায় হয়রানি করা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি সরকারি কর্মকর্তার ওপর হামলা বা হত্যার হুমকির অভিযোগও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চান্দগাঁও থানার উপপরিদর্শক মোহাম্মদ ফয়সলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সরকারের প্রচলিত বিধিবিধান ও আইন অনুসরণ করে নিরপেক্ষভাবে মামলাটি তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তের ফলাফল নির্ধারিত সময়ে সংশ্লিষ্ট আদালতে দাখিল করা হবে বলেও তিনি জানান।
একদিকে একজন সরকারি প্রকৌশলীকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ, অন্যদিকে মামলার বাদীর নিজের বক্তব্যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার চাপের বিষয়টি উঠে আসা এবং ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ—সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন কেবল একটি থানার মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহার এবং সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহির প্রশ্নও জড়িত।
বিশেষ করে পাঁচলাইশ থানার পরিবর্তে চান্দগাঁও থানায় মামলা দায়েরের কারণ, সংশ্লিষ্ট দুই ব্যাংকের সিসিটিভি ফুটেজ, ব্যাংক হিসাবের লেনদেন বিবরণী, জমা স্লিপ এবং প্রকল্পের ঠিকাদারি নথিপত্র একসঙ্গে পরীক্ষা করা হলে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সম্ভব।
প্রশ্ন হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে কি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁর দপ্তরে হামলার ঘটনা ঘটেছিল, নাকি কথিত ৫০ লাখ টাকা লেনদেন ও ঠিকাদারি কার্যাদেশসংক্রান্ত বিরোধ থেকেই মামলার সূত্রপাত? মামলার বাদী কেন বলেছেন যে তিনি নিজে মামলা করতে চাননি? এজাহারে ঘটনাস্থল পাঁচলাইশ থানাধীন উল্লেখ থাকার পরও চান্দগাঁও থানায় মামলা দায়েরের কারণ কী? পাঁচলাইশ থানার ভূমিকা কী ছিল? সংশ্লিষ্ট দুই ব্যাংকের সিসিটিভি ফুটেজে কি কথিত অর্থ জমার সময় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর উপস্থিতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যাবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর একমাত্র নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি, মামলার প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের পাশাপাশি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া, বিএডিসির প্রকল্পের ঠিকাদারি কার্যক্রম, কথিত আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের আইনসম্মত অনুসন্ধান নিশ্চিত করা হোক।
সরকারি দায়িত্ব ও ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা মিথ্যা মামলা—কোনোটিই যেন পার পেয়ে না যায়। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন।