ব্রেন টিউমারের লক্ষণ ও উপসর্গ, যা কখনই অবহেলা করবেন না

প্রকাশ: সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ০৪:২৯ অপরাহ্ণ
ব্রেন টিউমারের লক্ষণ ও উপসর্গ, যা কখনই অবহেলা করবেন না

লাইফস্টাইল প্রতিবেদক :মাথাব্যথা, হঠাৎ খিঁচুনি, শরীরের একপাশের কোনো অংশে দুর্বলতা কিংবা কথা বলতে বা বুঝতে সমস্যা হওয়া—দৈনন্দিন জীবনে অনেকেই এসব উপসর্গকে খুব সাধারণ শারীরিক ক্লান্তি বা সাধারণ সমস্যা ভেবে অবহেলা করেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এগুলো হতে পারে ব্রেন টিউমারের (Brain Tumor) অমোঘ সতর্ক সংকেত। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের মস্তিষ্ক যেহেতু পুরো শরীরের প্রতিটি ছোট-বড় ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে, তাই খুলির ভেতরে ছোট একটি টিউমার বা কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিও অত্যন্ত গুরুতর শারীরিক জটিলতা তৈরি করতে পারে। ফলশ্রুতিতে, এই লক্ষণগুলো প্রাথমিক অবস্থাতেই দ্রুত ও সঠিকভাবে শনাক্ত করা জীবনের সুরক্ষার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আজ সোমবার, ৮ জুন বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব ব্রেন টিউমার দিবস’। প্রতি বছর এই দিনে বিশ্বব্যাপী ব্রেন টিউমার সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা বৃদ্ধি, এর প্রাথমিক লক্ষণগুলো সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এবং অবহেলা না করে দ্রুত সঠিক নিউরোলজিক্যাল চিকিৎসা নেওয়ার গুরুত্বের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়। ভারতের নয়ডার ফোর্টিস হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের প্রখ্যাত পরিচালক ডা. জ্যোতি বালা শর্মার মতে, টিউমারের অবস্থান, ধরন ও আকার অনুযায়ী একেকজন মানুষের শরীরে উপসর্গ একেক রকম হতে পারে। তবে এমন ৫টি মৌলিক লক্ষণ রয়েছে, যা দেখা দিলে কখনই কালক্ষেপণ করা উচিত নয়।

আজ সোমবার (৮ জুন) বিকেল ৩টা ১০ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘লাইফস্টাইল, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্য সচেতনতা’ এবং ‘নিউরো-মেডিসিন গবেষণা, টিউমার ট্র্যাকিং ও আধুনিক সার্জারি উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে ব্রেন টিউমারের সেই ৫টি প্রধান লক্ষণ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

মাথাব্যথা আমাদের জীবনের অত্যন্ত সাধারণ একটি সমস্যা হলেও সব মাথাব্যথা কিন্তু একরকম নয়। মানব মস্তিষ্ক মাথার খুলির ভেতরে অত্যন্ত সীমিত ও সুনির্দিষ্ট একটি জায়গায় অবস্থান করে। সেখানে কোনো টিউমার তৈরি হলে খুলির ভেতরের প্রাকৃতিক চাপ (Intracranial Pressure) বহুগুণ বেড়ে যায়, যা তীব্র মাথাব্যথার প্রধান কারণ। বিশেষজ্ঞরা জানান, যদি মাথাব্যথা প্রতিদিন ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, সাধারণ ব্যথানাশক ওষুধেও না কমে, আগের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র হয়, বিশেষ করে ভোরবেলায় ঘুম ভাঙার পর বেশি অনুভূত হয় অথবা মাথাব্যথার সাথে বমি বমি ভাব ও প্রজেক্টাইল বমি দেখা দেয়, তবে তা ব্রেন টিউমারের বড় লক্ষণ হতে পারে।

আমাদের মস্তিষ্ক মূলত সূক্ষ্ম বৈদ্যুতিক সংকেত বা নিউরোনাল সিগন্যালের মাধ্যমে কাজ করে। টিউমার যখন মস্তিষ্কের সুস্থ টিস্যুর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, তখন সেই সংকেতের স্বাভাবিক কার্যপ্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এর ফলে রোগীর হঠাৎ খিঁচুনি বা ফিট হওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে, আগে জীবনে কখনো খিঁচুনি বা মৃগীরোগের ইতিহাস নেই এমন কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের যদি হঠাৎ করে শরীর কাঁপানো, জ্ঞান হারানো, কিছু সময়ের জন্য ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা বা শরীরের অস্বাভাবিক নড়াচড়া দেখা যায়, তবে একে ব্রেন টিউমারের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে গণ্য করা হয়।

মস্তিষ্কের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ডান পাশের মস্তিষ্ক মানুষের শরীরের বাম পাশের অংশ এবং বাম পাশের মস্তিষ্ক শরীরের ডান পাশের সমস্ত নড়াচড়া ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে। টিউমার মস্তিষ্কের মোটর কর্টেক্স বা চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী অংশে চাপ দিলে হাত বা পায়ে তীব্র দুর্বলতা বা অবশ ভাব দেখা দিতে পারে। অনেক সময় রোগীর সোজা হয়ে হাঁটতে সমস্যা হয়, বারবার হোঁচট খায়, শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে না কিংবা হাত-পায়ের সমন্বয়ে অসুবিধা হয়। এই উপসর্গগুলো সাধারণত রাতারাতি না হয়ে ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়।

মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল বা টেম্পোরাল লোবের কিছু সুনির্দিষ্ট অংশ মানুষের ভাষা, বাচনভঙ্গি ও কথাবার্তা নিয়ন্ত্রণ করে। টিউমার সেই অংশে আঘাত করলে রোগীর কথা জড়িয়ে যেতে পারে, কথা বলার সময় ভুল শব্দের ব্যবহার হতে পারে কিংবা মনের ভাব প্রকাশ করতে গিয়ে সঠিক শব্দটি খুঁজে পেতে তীব্র বেগ পেতে হয়। অনেক সময় রোগী অন্যের সহজ কথা বা নির্দেশও সহজে বুঝতে পারেন না। শুরুতে এই পরিবর্তনগুলো খুব সূক্ষ্ম হলেও পরিবারের সদস্যরা এটি দ্রুত ধরতে পারেন।

চোখ ভালো থাকার পরও হঠাৎ করে চারপাশ ঝাপসা দেখা, একটি জিনিসকে দুটি দেখা (Double Vision), চারপাশের বা পাশের জিনিসগুলো দেখতে না পাওয়া কিংবা হুট করে এক চোখে কম দেখা মস্তিষ্কের টিউমারের অন্যতম বড় উপসর্গ। যেহেতু টিউমার অপটিক নার্ভ বা দৃষ্টির স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং এই পরিবর্তনটি খুব ধীরে ধীরে হয়, তাই অনেকেই একে সাধারণ চোখের পাওয়ারের সমস্যা ভেবে ভুল করেন এবং চক্ষু চিকিৎসকের কাছে গিয়ে মূল্যবান সময় নষ্ট করেন।

নিউরোলজি বিশেষজ্ঞদের মতে, সব মাথাব্যথা বা খিঁচুনি মানেই যে সেটি ব্রেন টিউমার—তা কিন্তু নয়; অন্য অনেক সাধারণ নিউরোলজিক্যাল রোগেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে নতুন কোনো উপসর্গ দেখা দিলে, তা যদি ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে কিংবা একাধিক সমস্যা একসঙ্গে দেখা দেয়, তবে অবিলম্বে একজন বিশেষজ্ঞ নিউরোলজিস্ট বা নিউরোসার্জনের পরামর্শ নিয়ে এমআরআই (MRI) বা সিটি স্ক্যান করানো উচিত। প্রাথমিক অবস্থায় রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হলে আধুনিক চিকিৎসায় ব্রেন টিউমার সম্পূর্ণ নিরাময় করা এবং যেকোনো ধরনের গুরুতর শারীরিক জটিলতা এড়ানো সম্ভব।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন