নাজমুল হাসান, মাদারীপুর প্রতিনিধি: রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন সীমান্তে সম্মুখ সমরে অংশ নেওয়া মাদারীপুরের সুরুজ কাজী (৩৫) নামের এক বাংলাদেশি যুবক ড্রোন ও মাইন হামলায় নিহত হয়েছেন। গত সোমবার (১৮ মে) প্রতিপক্ষের ভয়াবহ হামলায় তিনি রণক্ষেত্রেই প্রাণ হারান।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২১ মে) সন্ধ্যায় রাশিয়ায় অবস্থানরত সহকর্মীদের মাধ্যমে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয় পরিবার।
নিহত সুরুজ মাদারীপুর সদর উপজেলার দক্ষিণ খাগড়াছড়া এলাকার শাহাবুদ্দিন কাজীর ছেলে। উন্নত জীবনের আশায় বিদেশের মাটিতে গিয়ে লাশ হয়ে ফেরার এই খবরে পুরো এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সংসারের দারিদ্র্য দূর করতে ও উন্নত জীবনের আশায় এক বাংলাদেশি দালালের মাধ্যমে প্রথমে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টা করেন সুরুজ। সেখানে ব্যর্থ হয়ে একটি অসাধু ট্রাভেল এজেন্সির লোভনীয় অফারে পড়ে আট মাস আগে তিনি রাশিয়ায় পাড়ি জমান। সেখানে ভালো বেতনে স্বাভাবিক অন্য কাজে যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর ওই চক্রটি তাঁকে ব্ল্যাকমেইল করে এবং বাধ্যতামূলকভাবে রুশ সেনাবাহিনীতে বিক্রি করে দেয়।
সম্প্রতি সুরুজকে ইউক্রেন সীমান্তের সম্মুখ যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠায় রুশ বাহিনী। সেখানে গত সোমবার ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলা ও মাইন বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় সুরুজের দেহ। প্রথমে রুশ বাহিনীর পক্ষ থেকে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও, সেখানে অবস্থানরত দুই বাংলাদেশি প্রবাসী যুবক মুঠোফোনে সুরুজের পরিবারকে এই মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর জানান।
তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সুরুজ ছিলেন সবার বড়। তিন মাস আগেই সুরুজের একমাত্র দুই বছর বয়সী সন্তান ঠান্ডাজনিত রোগে মারা যায়। সন্তানের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই একমাত্র স্বামীকে হারিয়ে পাগলপ্রায় স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার (২২)। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ছেলেও নাই, স্বামীও নাই। কারে আগলাই বাঁচুম আমি? আল্লাহ গো, তুমি আমারেও লইয়া যাও।” বাকরুদ্ধ পিতা শাহাবুদ্দিন কাজী সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে বলেন, “বিদেশে গেল ভালো থাকার লিগা, এখন সব শেষ হইয়া গেল। শেষবারের মতো ছেলের মুখটা একবার দেখতে চাই। আমার ছেলের লাশটা যেন দেশে এনে দেওয়া হয়।”
এ বিষয়ে মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, “এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলে লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারিভাবে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে। এছাড়া শোকাহত পরিবারটির পাশে উপজেলা প্রশাসন সবসময় থাকবে।”
মাদারীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, “রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে মাদারীপুরের এক যুবকের মৃত্যুর খবর আমরা স্বজনদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। তিনি কীভাবে বা কোন দালালের মাধ্যমে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন, সে তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নিহতের পরিবার মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ দায়ের করলে আমরা তদন্ত করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেব।”
এ.আই.এল/সকালবেলা