মণিরামপুরে আপন ভাইকে হত্যাচেষ্টা, তদন্তে পুলিশ

প্রকাশ: শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬, ০৬:০৮ অপরাহ্ণ
মণিরামপুরে আপন ভাইকে হত্যাচেষ্টা, তদন্তে পুলিশ

আব্দুল্লাহ আল মামুন, যশোর প্রতিনিধি: যশোরের মণিরামপুরে পৈতৃক বসতবাড়ির জমিজমা ও প্রবাসী ভাইয়ের অর্জিত সম্পদ কুক্ষিগত করার জেরে এক ব্যক্তিকে পরিকল্পিতভাবে কুপিয়ে ও পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার চেষ্টা চালানোর অভিযোগ উঠেছে তাঁরই আপন ভাই ও বোন জামাইয়ের বিরুদ্ধে। 

গত বুধবার (২০ মে) বেলা ১টার দিকে উপজেলার ১নং রহিতা ইউনিয়নের রহিতা শেখপাড়া গ্রামে এই বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় গুরুতর জখম মো. হযরত আলী (৫০) বর্তমানে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই ঘটনায় মণিরামপুর থানায় মামলা দায়েরের পর বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্তে নেমেছে পুলিশ।

মামলার এজাহার ও ভুক্তভোগীর পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, রহিতা শেখপাড়ার মৃত শেখ আয়ন উদ্দিনের ছেলে প্রবাসী হযরত আলীর সাথে তাঁর অন্য ভাইদের পৈতৃক জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। এ নিয়ে হযরত আলী বাদী হয়ে আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা করার পর থেকেই আসাদুল, জহিদুল ইসলাম জয়েদসহ অন্য ভাইয়েরা ও বোন জামাই মামলা তুলে নেওয়ার জন্য হযরত আলীকে অনবরত প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছিলেন।

ঘটনার দিন (২০ মে) দুপুরে মাঠের বন্ধকী জমির জন্য গচ্ছিত রাখা নগদ ৩ লাখ ৫ হাজার টাকা নিয়ে এক পাওনাদারকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে হযরত আলী তাঁর দ্বিতল বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলেন। এ সময় আগে থেকে ওত পেতে থাকা তাঁর আপন ভাই জহিদুল ইসলাম জয়েদ, জয়েদের স্ত্রী মোছাঃ শারমিন, মোঃ সাজ্জাদ হোসেন, মোঃ অহেদ আলী, মোঃ সায়েদ আলী এবং বোন জামাই মোঃ নূর নবী দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তাঁর ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীদের মধ্যে একজন হযরত আলীকে হত্যার উদ্দেশ্যে ধারালো কুড়াল দিয়ে তাঁর মাথায় কোপ মারে। তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়লে বাকিরা বাঁশ, লোহার রড ও থ্রেড পাইপ দিয়ে তাঁকে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে শরীরের বিভিন্ন হাড় গুঁড়িয়ে দেয়। পরে প্রতিবেশীরা এগিয়ে আসলে হামলাকারীরা টাকা লুট করে পালিয়ে যায়।

রক্তাক্ত অবস্থায় হযরত আলীকে প্রথমে মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল (সদর) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও মাথায় গভীর ক্ষত থাকায় তাঁর অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক।

আহত হযরত আলী হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমি দীর্ঘ বছর প্রবাসে রক্ত জল করে টাকা কামিয়ে এই বাড়ি-গাড়ি করেছি। বাবা মারা যাওয়ার পর ভাইয়েরা নিজের অংশ পাওয়ার পরও আমার উপার্জিত সব সম্পদ কুক্ষিগত করতে আমাকে প্রাণনাশের পরিকল্পনা করেছে। শুধু তাই নয়, আমাকে যদি ওরা মারতে ব্যর্থ হয়, তবে জহিদের অন্তসত্ত্বা স্ত্রী শারমিনের গর্ভের বাচ্চা নিজেরা নষ্ট করে আমাকে ও আমার পরিবারকে মিথ্যা হত্যা মামলায় ফাঁসানোর নতুন নীল নকশা করেছে। আমি বাঁচতে চাই ভাই, আপনারা আমাকে বাঁচান, প্রশাসন আমাকে বাঁচাক!”

এদিকে, এই হামলার বিষয়ে প্রধান অভিযুক্ত জহিদুল ইসলাম জয়েদের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে বলেন, “থানা পুলিশ আর যশোরের বড় বড় সাংবাদিক আমাদের পকেটে আছে, মামলা-হামলা করে আমাদের কিছুই করা যাবে না।”

আপন ভাইয়ের ওপর ভাইদের এমন মধ্যযুগীয় ও নৃশংস হামলার ঘটনায় পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র ফুটে উঠেছে। মণিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবু সাঈদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “রক্তের সম্পর্কের ভাইয়ের ওপর জমি ও টাকার জন্য এমন বর্বরোচিত হামলা অত্যন্ত নজিরবিহীন ও দুঃখজনক। ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগটি নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। আসামিরা যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আসামিদের গ্রেফতার করতে পুলিশের একাধিক টিম অভিযানে নেমেছে।”

এ.আই.এল/সকালবেলা

মন্তব্য করুন