৩০০ টাকায় ১০ ঘণ্টা খাটুনি, শেষ হয় না রূপসীদের জীবনযুদ্ধ

৩০০ টাকায় ১০ ঘণ্টা খাটুনি, শেষ হয় না রূপসীদের জীবনযুদ্ধ

 আকাশছোঁয়া দ্রব্যমূল্য আর তপ্ত রোদের মাঝে ঠাকুরগাঁওয়ের নারী কৃষি শ্রমিকদের জীবন কাটছে চরম অনিশ্চয়তায়। দিনভর ১০ ঘণ্টা হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে মাত্র ৩০০ টাকা মজুরি পাচ্ছেন তাঁরা, যা দিয়ে বর্তমান বাজারে একবেলা মাছ-ভাত জোটানোও দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে।

ঘাম ঝরানো জীবন, তবুও অভাব

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের চৌরঙ্গী বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, প্রখর রোদ উপেক্ষা করে শসা খেতে কাজ করছেন একদল নারী। তাঁদেরই একজন রূপসী রানী (৩৫)। ক্লান্ত গলায় তিনি বলেন, “দশ ঘণ্টা খাটুনি করি, তাও তিনশ টেকা। একদিন কামে না গেলে চুলাত হাড়ি উঠে না। বাজারে গেলেই মনে হয় আগুন লাগিছে। ছোট মাইডা মাছ ভাত খাবার চাইলে বুকটা ফাইটা যায়।”

রূপসীর মতো প্রতিমা, অশুবালা ও বৈতালী রানীদের জীবনও একই বৃত্তে বন্দি। সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করেও দিনশেষে যে অর্থ পান, তা দিয়ে চাল-ডাল কিনতেই হিমশিম খেতে হয়। অশুবালা আক্ষেপ করে বলেন, “এক লিটার তেলের দামই ২০০ টেকা। ৩০০ টেকা দিয়া সংসার চলে কেমনে? কিস্তির চাপ আর অসুস্থ স্বামীর ওষুধ—সব মিলায়া হামরা দিশাহারা।”

মজুরি বৈষম্য ও বর্তমান সংকট

মাঠে সমান সময় ও সমান পরিশ্রম করলেও মজুরির ক্ষেত্রে চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন নারী শ্রমিকরা। তাঁদের অভিযোগ, একই কাজে পুরুষ শ্রমিকরা যেখানে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পান, সেখানে নারীদের দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা।

স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, সার, বীজ ও সেচ খরচ বেড়ে যাওয়ায় তাঁরাও বিপাকে। কৃষক জয়নুল ও আল মামুন জানান, নারী শ্রমিকরা কাজে দক্ষ হলেও ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় তাঁরা মজুরি বাড়াতে পারছেন না।

প্রশাসনের বক্তব্য

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা কৃষি অফিসার মো. নাসিরুল আলম বলেন, কৃষি উৎপাদনে নারী শ্রমিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মজুরি বৈষম্য কমিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তিনি।

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. খাইরুল ইসলাম জানান, নিম্নআয়ের মানুষের কষ্ট লাঘবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সহায়তা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে এবং তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে।

আধুনিক যুগেও সমান কাজে অসমান মজুরি আর জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের এই বিশাল ব্যবধান ঠাকুরগাঁওয়ের চরাঞ্চলের নারীদের জীবনযুদ্ধকে দিন দিন আরও কঠিন করে তুলছে।

জান্নাত/সকালবেলা

মন্তব্য করুন