পারস্য উপসাগরের জ্বালানি: হরমুজ প্রণালি বন্ধে হুমকিতে বিশ্ব অর্থনীতি

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের জেরে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে বাড়ছে তেল-গ্যাসের দাম, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পাকিস্তান ও ভারত

পারস্য উপসাগরের জ্বালানি: হরমুজ প্রণালি বন্ধে হুমকিতে বিশ্ব অর্থনীতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের জেরে জ্বালানি-বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম সংকটের মুখে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্বে মোট জ্বালানির প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ সরবরাহ করা হয়। কিন্তু ইরান এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম হুহু করে বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে পেট্রল থেকে শুরু করে জেট ফুয়েল পর্যন্ত সব ধরনের জ্বালানিপণ্যে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট জ্বালানিসংকটের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে শুরু করে পাকিস্তানের লাহোর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। তবে এই সংকটে বিশ্বের কিছু দেশ অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশ—কুয়েত, ইরাক, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ইরানের উৎপাদিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতার পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এশীয় দেশগুলোই বর্তমানে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাচ্ছে। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশই গেছে এশিয়ায়। মোট জ্বালানির ৩৫ শতাংশ পারস্য উপসাগর থেকে আমদানি করে চীন এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হলেও, শতকরা হিসেবে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে পাকিস্তান। তাদের মোট আমদানির ৮১ শতাংশই আসে এখান থেকে। পরিস্থিতি সামলাতে পাকিস্তান এরই মধ্যে চার দিনের কর্মসপ্তাহ এবং দূরবর্তী কাজের কথা ভাবছে। অন্যদিকে, ৫০ শতাংশ নির্ভরতা থাকা ভারতে রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া জাপান (৫৭%), থাইল্যান্ড (৫৬%) ও দক্ষিণ কোরিয়াও (৫৪%) ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছে। জ্বালানি তেলের অভাবে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছে বিমান পরিবহন সংস্থাগুলো। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা মাত্র ১ শতাংশ।

এশিয়ার তুলনায় ইউরোপ ঐতিহ্যগতভাবে উপসাগরীয় তেলের ওপর কিছুটা কম নির্ভরশীল। আগে রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল থাকলেও বর্তমানে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও নরওয়ের কাছ থেকে বেশি জ্বালানি সংগ্রহ করছে। গ্রিস (৩৬%), পোল্যান্ড (৩০%), ইতালি (২২%) এবং ফ্রান্স (১৮%) পারস্য উপসাগর থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আগে থেকেই জ্বালানিসংকটে থাকা ইউরোপীয় দেশগুলো বর্তমান পরিস্থিতিতে দুর্বল অর্থনীতি নিয়ে শিল্প খাত পুনর্গঠন এবং সস্তা চীনা পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হিমশিম খাচ্ছে। বাজার স্থিতিশীল করতে যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে সমুদ্রপথে থাকা রাশিয়ার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করলেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখনো এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। অন্যদিকে আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে মিসর (৪৫%) এবং দক্ষিণ আফ্রিকা (৩৩%) বড় ধরনের ধাক্কা খাচ্ছে। শুধু তেল-গ্যাসই নয়, পারস্য উপসাগরে সার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকা অঞ্চলে খাদ্যের দাম মারাত্মকভাবে বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা দরিদ্র দেশগুলোর ঋণের বোঝা আরও ভারী করবে। বিশ্বজুড়ে এই প্রভাব থেকে মুক্ত নয় আমেরিকাও। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল ও গ্যাস উৎপাদক দেশ হওয়া সত্ত্বেও এবং পারস্য উপসাগরের ওপর তাদের নির্ভরতা মাত্র ১০ শতাংশ হলেও বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় তাদের অর্থনীতিও চাপে পড়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রে গ্যালনপ্রতি পেট্রলের দাম প্রায় ১ ডলার বেড়েছে এবং মূল্যস্ফীতির আশঙ্কায় গৃহঋণের সুদ তিন মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে, আর এ কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল না হয়েও ইরানের অবরোধ ভাঙতে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

এম.এম/সকালবেলা

মন্তব্য করুন