নিজস্ব প্রতিবেদক: আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও জাতীয় নেতাদের উত্তরসূরিদের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক শক্তি ব্যাপকভাবে বাড়াচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলীয় সূত্র বলছে, বর্তমানে শুধু সাধারণ সদস্য সংগ্রহ নয়, বরং দেশের বিভিন্ন প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবার, গণ-অভ্যুত্থান ও আন্দোলনভিত্তিক সংগঠন এবং সাবেক পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক নেতাদের একই প্ল্যাটফর্মে আনার চেষ্টা চলছে। এর মাধ্যমে দলটি জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করে একটি শক্তিশালী বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চাইছে।
এই সম্প্রসারণ কৌশলের অংশ হিসেবে গতকাল মঙ্গলবার (৫ মে ২০২৬) এনসিপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামীর ছোট ছেলে ও গবেষক ড. মোহাম্মদ নাদিমুর রহমান, ঐতিহাসিক ফরায়েজী আন্দোলনের নেতা হাজি শরীয়তুল্লাহর বংশধর আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ হোসাইন, গাজীপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক এম এ এইচ আরিফ এবং ‘ওয়ারিয়র্স অব জুলাই’-এর সদস্যরা। রাজধানীর বাংলামোটরে দলের অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁরা এনসিপিতে যুক্ত হন।
নতুন যোগদানকারীদের মধ্যে ড. মোহাম্মদ নাদিমুর রহমান বর্তমানে তুরস্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকায় গতকালের সশরীরে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি; তবে তিনি সুদূর তুরস্ক থেকে অনলাইনে যুক্ত হয়ে দলে যোগ দেন। অন্যদিকে ‘ওয়ারিয়র্স অব জুলাই’-এর কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে প্রায় ৫০ জন সংবাদ সম্মেলনে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের দাবি, এই প্ল্যাটফর্মের প্রায় ৪ হাজার সদস্য এনসিপির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দলটিতে যুক্ত হয়েছেন।
এর আগে গত ২৪ এপ্রিলও দলটিতে একটি বড় যোগদান অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা ইসহাক সরকার, অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নাতনি ফেরসামিন হক ইকবাল (ফ্লোরা), জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর নুরুজ্জামান কাফি এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রেলের অনিয়ম নিয়ে আন্দোলন করে দেশজুড়ে আলোচনায় আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মহিউদ্দিন রনি এনসিপিতে যোগ দিয়েছিলেন।
এনসিপির বিস্তৃতি ও নতুন জোয়ার প্রসঙ্গে দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, “এনসিপিতে দেশের মানুষ ও তরুণ সমাজ একটি নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনা দেখছেন। এ জন্যই সবাই যুক্ত হচ্ছেন। অন্য দল থেকেও দেশপ্রেমী এবং সংস্কারপন্থী অনেকেই এনসিপিতে আসছেন। যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে তাঁদের নিতে আমাদের কোনো আপত্তি নাই।”
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির একজন হেভিওয়েট স্থায়ী কমিটির সদস্যের সন্তানও এনসিপিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে বর্তমানে আলোচনা চালাচ্ছেন। এছাড়া দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়া বিএনপির ঢাকা মহানগরীর একজন সাবেক শীর্ষ নেতার পাশাপাশি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মনজুর আলমের সাথেও এনসিপির নীতি-নির্ধারকদের যোগাযোগ ও ইতিবাচক আলোচনা চলছে বলে গুঞ্জন রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপি মূলত তিনটি কৌশলে নিজেদের বিস্তার ঘটাচ্ছে—নতুন করে দলভুক্তি বাড়ানো, সহযোগী সংগঠন যুক্ত করা এবং চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতাকে কেন্দ্র করে তরুণ প্রজন্মকে সংগঠিত করা। তবে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে যে, বামপন্থীদের কোণঠাসা করে এনসিপিতে ডানপন্থীদের উত্থান হচ্ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন সাবেক ছাত্রশিবির নেতার দলটিতে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে এই আলোচনা নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে।
এই বিষয়ে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, “আমরা কোনো চরমপন্থী দল নই, আমরা একটি মধ্যমপন্থী দল। এখানে ডান, বাম সকলেই আছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে সামাজিক আন্দোলনকর্মী যাঁরা দেশের প্রকৃত পরিবর্তন চাচ্ছেন এবং যাঁদের বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতি, অস্ত্রবাজি, সন্ত্রাস বা চাঁদাবাজির রেকর্ড নাই, আমরা কেবল তাঁদেরই জায়গা করে দিচ্ছি।”
এনসিপির নেতারা স্পষ্ট করেছেন যে, বিগত ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগের অথবা ‘এই ঘরানার’ নিষ্কলুষ ও অপরাধমুক্ত নেতারাও চাইলে এনসিপিতে যুক্ত হতে পারেন। সারোয়ার তুষার জানান, যাঁরা ছাত্রলীগের মধ্যে থেকেও বিগত গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্রদের পক্ষে অংশ নিয়েছিলেন এবং যাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অপরাধের রেকর্ড বা অভিযোগ নেই, তাঁরা এনসিপিতে যুক্ত হতে পারবেন। হান্নান মাসউদও একই সুরে বলেন, “অত্যাচারী, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ কাউকে আমরা দলে জায়গা দেব না। তবে এর বাইরে থাকা পরিচ্ছন্ন নাগরিকদের আমরা স্বাগত জানাই।”