আন্তর্জাতিক ডেস্ক: কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন সেনাবাহিনীর হামলায় পাঁচজন নিরীহ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ইরান। মার্কিন সামরিক বাহিনী যে নৌকাগুলোকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) আক্রমণাত্মক বোট বলে দাবি করছে, তেহরানের মতে সেগুলো আসলে সাধারণ যাত্রীবাহী নৌকা ছিল।
মঙ্গলবার (৫ মে ২০২৬) ইরানের একজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা জানান, ওমানের খাসাব উপকূল থেকে ইরানের দিকে আসার সময় দুটি ছোট নৌকায় হামলা চালায় মার্কিন নৌবাহিনী। এতে নৌকা দুটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় এবং পাঁচ যাত্রী প্রাণ হারান। ইরান এই ঘটনাকে মার্কিন বাহিনীর “গুরুতর অপরাধ” হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা দাবি করেছে।
ইরানের এই দাবি নিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (CENTCOM) অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জানিয়েছেন, তাদের অভিযানে বাধা দিতে আসায় মার্কিন বাহিনী আইআরজিসি-র অন্তত ছয়টি নৌকা ডুবিয়ে দিয়েছে। পরবর্তীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডুবিয়ে দেওয়া নৌকার সংখ্যা সাতটি বলে উল্লেখ করেন।
মূলত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পর থেকে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ অবরুদ্ধ করে রাখে, যার ফলে প্রায় ২ হাজার বাণিজ্যিক জাহাজ সেখানে আটকা পড়ে। এই অবরুদ্ধ জাহাজ ও নাবিকদের উদ্ধার করতে গত রবিবার (৩ মে) ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামক বিতর্কিত সামরিক অভিযানের ঘোষণা দেন। সোমবার থেকে শুরু হওয়া এই অভিযান গত ৮ এপ্রিল দুই দেশের মধ্যে হওয়া নাজুক যুদ্ধবিরতিকে আবারও খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে এই জলপথে জাহাজ চলাচলকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। হরমুজ প্রণালী নিয়ে এখন নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মার্কিন প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে সহ্য করতে পারবে না।”
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, “সোমবার হরমুজ প্রণালীতে যা ঘটেছে, তা স্পষ্ট করে দেয় যে এই রাজনৈতিক সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই।” তিনি উল্লেখ করেন যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি শান্তি আলোচনা এগোচ্ছিল, কিন্তু মার্কিন “দুঃসাহসিকতা” এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো আঞ্চলিক মিত্রদের প্ররোচনা পরিস্থিতিকে ‘প্রজেক্ট অচলাবস্থা’র দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ইরানের কঠোর অবস্থানের বিপরীতে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত আক্রমণাত্মক হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, “যদি ইরান ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’-এর অংশ হিসেবে চলাচলকারী কোনো মার্কিন জাহাজে হামলা চালানোর দুঃসাহস দেখায়, তবে ইরানকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে ফেলা হবে।” তিনি আরও দাবি করেন, বিশ্বজুড়ে মার্কিন ঘাঁটিগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক ও উন্নত সমরাস্ত্রে সজ্জিত।
এই উত্তেজনার মধ্যেই সংযুক্ত আরব আমিরাত অভিযোগ করেছে যে ইরান তাদের ভূখণ্ডে ১৫টি ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যার ফলে ফুজাইরাহ অঞ্চলের একটি বড় তেল শোধনাগারে আগুন ধরে যায়। অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার ফ্ল্যাগশিপ ক্যারিয়ারের নবনির্মিত জাহাজ ‘এইচএমএম নামু’ ওমানের উপকূলের কাছে একটি রহস্যময় বিস্ফোরণের শিকার হয়েছে। জাহাজটির ইঞ্জিন রুমে আগুন লাগায় সেটি বর্তমানে অচল হয়ে দুবাই বন্দরে নোঙর করার অপেক্ষায় রয়েছে, তবে এর ২৪ জন ক্রু সুরক্ষিত আছেন।
বিশ্বের মোট পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করায় এই নতুন সামরিক সংঘাত বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল ও সারের দাম হু হু করে বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অচলাবস্থা দ্রুত নিরসন না হলে বিশ্ব অর্থনীতি এক ভয়াবহ মন্দা এবং খাদ্য সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে।