টেস্টে সেঞ্চুরির শীর্ষে মুশফিক

প্রকাশ: সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ০৫:৪০ অপরাহ্ণ
টেস্টে সেঞ্চুরির শীর্ষে মুশফিক

মুশফিকুর রহিমের সেঞ্চুরি উদযাপনের একটি নিজস্ব ও চেনা ভঙ্গি আছে। যেকোনো দলের বিপক্ষেই তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগার স্পর্শ করলে তিনি মনের আনন্দে তা উদযাপন করেন। তবে আজ সোমবার (১৮ মে) সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের বিপক্ষে পাওয়া রেকর্ডগড়া সেঞ্চুরিটি যেন একটু বেশিই উপভোগ করতে দেখা গেলো তাঁকে। খুররম শাহজাদের বলটি এক্সট্রা কাভার দিয়ে সীমানার বাইরে পাঠিয়েই অপর প্রান্তে গিয়ে নিজের ব্যাটটি মাটিতে ছুড়ে ফেলেন মুশি। এরপর গ্লাভস ও হেলমেট খুলে ড্রেসিংরুমের দিকে দুই বাহু প্রসারিত করেন। ক্রিজে থাকা সতীর্থ তাইজুল ইসলামকে শক্ত আলিঙ্গনে বাঁধার পর বিশ্বখ্যাত ব্যাটার ক্রিস গেইলের অনুকরণে ব্যাটের দুই দিক ধরে গ্যালারির সমর্থকদের দিকে বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকেন। এককভাবে টেস্টে দেশের মাটিতে ১৪তম সেঞ্চুরি করায় গ্যালারির এমন রাজকীয় অভিবাদন মুশফিকের প্রাপ্যই ছিল।

এতদিন টেস্ট ক্রিকেটে ১৩টি করে সেঞ্চুরি নিয়ে যৌথভাবে শীর্ষে ছিলেন মুমিনুল হক ও মুশফিকুর রহিম। দুজনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল একে অন্যকে ছাপিয়ে যাওয়ার এক অদৃশ্য লড়াই। মুমিনুলের সামনে বেশ কয়েকবার সুযোগ এসেছে ১৪তম সেঞ্চুরি করার। চলমান পাকিস্তানের বিপক্ষে ঢাকা টেস্টেই মাত্র ৯ রানের জন্য সেঞ্চুরি বঞ্চিত হন তিনি; আউট হন ৯১ রানে। সিলেট টেস্টের আগে টানা পাঁচটি ইনিংসে তাঁর হাফ সেঞ্চুরিও ছিল। মুমিনুল তাঁর শেষ সেঞ্চুরিটি পেয়েছিলেন কানপুরে ভারতের বিপক্ষে।

তবে এই জায়গায় মুশফিকুর রহিম সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। টেস্টে নিজের শেষ ১১টি ইনিংসের মধ্যে ৩টি সেঞ্চুরি তুলে নিলেন তিনি। গত বছর শ্রীলঙ্কার গলে খেলেছিলেন ১৬৩ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস। এরপর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে মিরপুরে করেছিলেন ১০৬ রান। আর এবার সেঞ্চুরি পেলেন শক্তিশালী পাকিস্তানের বিপক্ষে। বর্তমান অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর সঙ্গে তাল মিলিয়ে এটি মুশফিকের টানা তিন সিরিজে সেঞ্চুরি পাওয়ার অনন্য কীর্তি।

চলমান সিরিজের ঢাকা টেস্টে ৭১ ও ২২ রান করেছিলেন মুশফিক। আর সিলেট টেস্টের প্রথম ইনিংসে আউট হয়েছিলেন ব্যক্তিগত ২৩ রানে। তবে আজ ম্যাচের তৃতীয় দিনে দ্বিতীয় ইনিংসে আর ভুল করেননি। সকালে শূন্য রানে নাজমুল হোসেন শান্তর সঙ্গে দিন শুরু করেছিলেন মুশফিক। মাত্র ৪ রান যোগ হতেই এই জুটি ভেঙে যায় যখন অধিনায়ক শান্ত ১৫ রানে আউট হন।

শান্ত বিদায় নেওয়ার পর মুশফিকুর রহিম ও লিটন কুমার দাসের চমৎকার এক প্রতিরোধ গড়া ব্যাটিং প্রদর্শনী দেখেন সিলেটের সমর্থকরা। এই দুই ব্যাটার ১৮৮ বলে ১২৩ রানের এক গুরুত্বপূর্ণ পার্টনারশিপ গড়েন। ম্যাচের মাঝে দুইবার জীবন পেয়ে লিটন ৯২ বলে ৬৯ রান করে আউট হন। লিটন যখন আউট হন, তখন ৯gaming ৯৬ বল খেলে ৪৯ রানে অপরাজিত ছিলেন মুশফিক। এরপর তিনি ১০৩ বলে ক্যারিয়ারের ৩০তম হাফ সেঞ্চুরিতে পৌঁছান। আর হাফ সেঞ্চুরি থেকে সেঞ্চুরিতে পৌঁছাতে খেলেন মাত্র ৭৫ বল। সেঞ্চুরি করার পথে তাঁর ইনিংসটি সাজানো ছিল ৯টি চার ও ১টি ছয়ের সাহায্যে।

পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্টে এটি মুশফিকের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি। এর আগে ২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের মাটিতেই ১৯১ রানের এক অনবদ্য ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। আজ শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হওয়ার আগে মুশফিকের ব্যাট থেকে আসে ১৩৭ রান। ২৩৩টি বলের মুখোমুখি হয়ে ১৪টি চার ও ১টি দৃষ্টিনন্দন ছক্কায় সাজানো ছিল তাঁর এই রেকর্ডগড়া ইনিংসটি।

২০০৫ সালে ক্রিকেটের তীর্থভূমি খ্যাত লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে মুশফিকুর রহিমের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল এই টেস্ট ফরম্যাট দিয়েই। অভিষেক ম্যাচে লর্ডসের কঠিন কন্ডিশনে ৫৬ বলে ১৯ রান করেছিলেন তিনি। আগামী ২৬ মে এই সাদা বলের দীর্ঘ সংস্করণে মুশফিকের ক্যারিয়ারের ২১ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে।

এই দীর্ঘ পথচলায় বাংলাদেশ দলকে তিন সংস্করণেই নেতৃত্ব দিয়েছেন মুশফিক। গুরুতর চোট ছাড়া ক্যারিয়ারের কোনোদিন জাতীয় দলের ম্যাচ মিস করতে চাননি তিনি। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, জাতীয় দলের নিয়মিত খেলার পাশাপাশি নিজের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে টি-টোয়েন্টি এবং ওয়ানডে ক্রিকেট থেকে আনুষ্ঠানিক অবসর নিলেও টেস্ট ক্রিকেটটা এখনো সমান নিবেদন নিয়ে খেলছেন। এই খেলার প্রতি তাঁর আত্মত্যাগই প্রমাণ করে টেস্ট ক্রিকেটটা তাঁর কাছে কতটা আবেগের ও প্রিয়।

ম্যাচ শেষে মুশফিকের কাছে সংবাদকর্মীরা জানতে চেয়েছিলেন, তিনি আর কত বছর টেস্ট ক্রিকেট খেলবেন? জবাবে অভিজ্ঞ এই ব্যাটার স্বভাবসুলভ হাসিতে বলেন, ‘এরকম তো কোনো লক্ষ্য নির্দিষ্ট করা নাই। কালকের ম্যাচও শেষ হয়ে যেতে পারে, আবার বাকিটা উপর আল্লাহ জানেন। আমি চেষ্টা করি প্রতিটা ম্যাচে অবদান রাখতে। যে কয়টা দিন বেঁচে থাকি যেন মাঠেই কাটাতে পারি, এই ইচ্ছা আছে। খেলা এখন ছাড়বো বা কবে ছাড়বো এরকম করে আগে থেকে সিদ্ধান্ত নেইনি। ইনশাআল্লাহ খুব ভালো সময় থাকতে থাকতেই খেলা ছেড়ে দিব।’

দীর্ঘ ২১ বছরের টেস্ট ক্যারিয়ার হলেও এখন পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো দ্বিপক্ষীয় টেস্ট সিরিজ খেলা হয়নি মুশফিকের। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ দল যখন তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ খেলতে অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিল, তখন দলের উইকেটরক্ষক ব্যাটার ছিলেন ধীমান ঘোষ। তবে সূচি অনুযায়ী, এ বছরই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজ খেলার কথা রয়েছে বাংলাদেশের। নিজের ফিটনেস ধরে রেখে সেখানে খেলার তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করে মুশফিক বলেন, ‘আমি অস্ট্রেলিয়ায় কোনো টেস্ট সিরিজ খেলিনি বিশ্বকাপ ম্যাচ ছাড়া। এটা আমার অনেক বড় একটা স্বপ্ন যে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট খেলা।’ ২১ বছরের দীর্ঘ পথচলায় ১০২টি টেস্ট ম্যাচ খেলা মুশফিকুর রহিম নিঃসন্দেহে দেশের ক্রিকেটের এক জীবন্ত প্রেরণার নাম।

জান্নাত/সকালবেলা

মন্তব্য করুন